মানবজাতি যেন আত্মবিস্মৃত হয়ে যাচ্ছে, মন সংকীর্ণ হয়ে যাচ্ছে, হীনতা গ্রাস করছে। অন্তরে
হিংসার অগ্নিশিখা দাবানলের মতো জ্বলছে। মানুষ ধূলিমলিত ভোগ্যবস্তু সম্ভোগ করতে
মনের আকাঙ্খা চরিতার্থ করতে চাইলেও সুখশান্তি পাওয়ার আশা অধরাই থেকে যায়। অবিদ্যায়
তমাচ্ছন্ন অশান্ত মানুষ ভূলোকে তৃষ্ণার জালে আটকা পড়ে
দুঃখই ভোগ করছে। বিজ্ঞানীরা গবেষণা চালিয়ে নতুন নতুন তত্ত্ব ও তথ্য প্রযুক্তি
আবিষ্কার করছেন। অজানাকে জানার আগ্রহে আর কেবল একটু
আরাম-আয়েশে সুখে থাকার জন্য। আদিকাল হতেই মানব সমাজকে
নানান ভোগবিলাসে রত থাকতে দেখা যায়। কিন্তু তাতে ভোগ, হীনমনোবৃত্তি
ও তৃষ্ণাগুলো দমিত হয়েছে, এমনটা দেখা যায় না।
অর্থনীতিবিদরা মাকড়সার জাল বিস্তার করে বৈশ্বিক অর্থনীতির উন্নতি সাধন করলেও
আগ্রাসন স্বভাব হেতু বিপরিণামধর্মী পরিলক্ষিত হয়। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় বর্তমান
সমস্যাসংকুল ভুবনে মানুষেরা হিংসা-বিদ্বেষের অস্ত্রের দ্বারা চরমভাবে করুণাকে বলি
দিচ্ছে।
তাই তো সংঘাত
সংকটময় পৃথিবীতে সত্ত্বগণকে মৈত্রীবারি বর্ষণে শান্তি আনয়নে এবং মুক্তির পথ
প্রদর্শন করতে মহাপুরুষগণ আবির্ভাব হয়েছেন যুগে যুগে। তাঁদের পুণ্য ও জ্ঞানের
প্রভায় আলোকিত হয় অজ্ঞান ও অন্ধকারাচ্ছন্ন সংসার। তাঁদের পুত-পবিত্র আদর্শ অনুসরণে
সত্ত্বগণ হিংসা-বিদ্বেষ ত্যাগ করে, তৃষ্ণার জাল থেকে মুক্ত হয়ে চিত্ত বিশুদ্ধ করতে পারে, প্রকৃতরূপে সুখী হতে পারে। মহাপুরুষ
বুদ্ধের অন্যতম অমোঘ বাণী হচ্ছে শীল বা নৈতিক আচরণগুলো সৎ ও সুন্দর করা। অর্থাৎ
সংযত আচরণ করা, পরিশুদ্ধতা লাভ করা।
এতে পরস্পরের প্রতি সৌহার্দ ও শান্তির মেলবন্ধন সৃষ্টি হয়।
শীল
অর্থ কী? শীলন অর্থে শীল। নৈতিক আচরণগুলো অনুশীলন করা; নৈতিক আচরণগুলো সুন্দর ও সুদৃঢ় করা। অর্থাৎ শীল হচ্ছে
কুশল কর্ম বা কুশল ধর্মগুলো প্রতিষ্ঠার জন্য একটি ভিত্তি। শীল অনুশীলন করতে গিয়ে
জ্ঞানী-পণ্ডিতগণ পাপের প্রতি ভয়শীল ও লজ্জাশীল হতে উপদেশ দিয়েছেন। শীলসম্পত্তি
আনন্দদায়ক, এটাই শীলের স্বভাব। পৃথিবীতে মাটিকে আশ্রয় করে
সকল বিষয় বর্ধিত হয়। বলা যায়, শীলকে ভর করেই কুশল ধর্মগুলো
বিকশিত বা বর্ধিত হয়।
কেন
শীল পালন করতে হয়? শুদ্ধ চরিত্রই কুশল ধর্মের মূল।
চারিত্রিক শুদ্ধতা জীবনকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করে এবং এটা ধর্মচর্চারও ভিত্তি। চরিত্র
শুদ্ধ, সুন্দর না হলে আধ্যাত্মিক জীবনের
বিকাশ হয় না। পতিত জমি আবাদ করে ফসল ফলাতে হলে প্রথমে আগাছা তুলে ফেলতে হয়।
আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতা লাভের জন্য সর্বাগ্রে দুঃশীলতা,
দুরাচার, দুর্নীতি ত্যাগ করে চরিত্র শোধন করা আবশ্যক।
অর্থাৎ সাধনমার্গের প্রথম সোপনই হচ্ছে শীল। বলা যায়, শীল
পালন করার অর্থ নিজেকে সংযমের পথে পরিচালিত করা;
আত্মশুদ্ধি, আত্মদর্শন, সম্যক
উপলব্ধি করা; হীন মনোবৃত্তিগুলো ত্যাগ করে মনের মধ্যে
মৈত্রীভাব উৎপন্ন করে জগতের প্রতি অনুকম্পা করা, সকল
সত্ত্বগণের প্রতি মৈত্রীভাব পোষণ করা; কুশল কর্মে নিজেকে
নিয়োজিত রাখা।
মানুষের মন
সবসময় কিছু না কিছু নিয়ে চিন্তায় মগ্ন থাকে। কখনো কুশল কর্মে, কখনো বা অকুশল কর্মের দিকে মন ধাবিত হয়। এখন, কুশল কী এবং অকুশল কী?
যেই চিত্ত
জীবন-দুঃখের হেতু তৃষ্ণার উৎপাদক, পরিপোষক
ও পরিবর্দ্ধক, তা-ই অকুশল। আবার, যে কর্মের মূলে আত্মহিত-পরিহিত সাধিত হয় না এবং বহুজনের অকল্যাণ, অহিত ও দুঃখ জড়িত থাকে, তা-ই অকুশল। অন্যদিকে, যেই চিত্ত
জীবন-দুঃখের হেতু তৃষ্ণার ক্ষয়কারক, সুকর্মগুলোর পরিপোষক
ও পরিবর্দ্ধক, সৌমনস্য ও সৌভাগ্য উৎপাদক এবং শ্রদ্ধা আদি
সুন্দর গুণযুক্ত, তা-ই কুশল। আবার, যে কর্মের মূলে আত্মহিত-পরিহিত সাধিত হয় এবং বহুজনের কল্যাণ, হিত ও সুখ জড়িত থাকে, তা-ই কুশল। যখন মনোচেতনা পাপ বা হানিকারক উপাদানে জোর দেয় তখন (কায় ও
বাক্য) দুই একটিতে আকৃষ্ট হয়ে চরিতার্থ করতে ইচ্ছুক বা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়। সংকল্প
গ্রহণে সংকল্প ব্যক্তির মানসিক শক্তি কেন্দ্রীভূত ও সঞ্চিত হয়।
পুনঃপুন একই
বিষয়ে মনন বা পুনচিন্তনের ফলে সঞ্চিত
মানসিক শক্তি বা বাক্যকারে প্রকাশিত হয়। যখন বাক্যকারে বিস্ফোরিত হয় অতঃপর লক্ষ্যে অর্জন করতে কার্যে পরিণত হয়। এ
মনোচেতনা একবারে কার্যে পরিণত হয় না। এভাবে মনোভিতরে শক্তি সঞ্চিত করে ধীরে
শক্তিশালী হয়ে আমাদের দৃষ্ট হয়। কায় দ্বারা সম্পাদিত হয়। তখন দশবিধ অকুশল কর্মপথে
কোন না কোন বিষয়ে লিপ্ত হই। যেমন- প্রাণী হত্যা করা, চুরি
করা, ব্যভিচারে রত হওয়া, মিথ্যা
বাক্য বলা, পিশুন বাক্য, পরুষ
বাক্য বা কর্কশ বাক্য, বৃথা বাক্য বলা, ব্যাপাদ, অবিদ্যা এবং মিথ্যাদৃষ্টি। এই দশবিধ
কার্যের মধ্যে যেকোন একটি সম্পাদনকালে মনোচেতনায় হিংসার উপাদান বা আলম্বন বলবতী
আকার ধারণ করে। যা শীলের তারতম্য ঘটায়। তখন মানুষের মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে ফেলে।
আমরা তাকে দুঃশীল বা দুরাচারি পাপিষ্ঠ আখ্যায়িত করি।
অপরদিকে যখন কুশল চেতনা উৎপন্ন হয় তখন বিবিধ উপকারক পুণ্যকাজে নিয়োজিত হয়ে
স্বস্তিবোধ করি এবং শোভন মনোবৃত্তি বা চৈতসিক গুলো বিস্তার করে অধিকতর গভীরে
প্রবেশে সক্ষম হয়। ধর্মের গাঢ়বতা বৃদ্ধি পায়। এভাবে যত ধর্মের শ্রীবৃদ্ধি ও
সমৃদ্ধি হবে তত ধর্মের আদর্শ রীতিনীতি ধর্মীয় মূল্যবোধ বিকাশ দার্শনিক ব্যাখ্যাত
হয়। সর্বোপরি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পরিধি গুরুত্বের অনুসন্ধানে আগ্রহী হয়। শীলের গুরুত্ব মানবের মনের ভিতরে যতদিন পর্যন্ত সুপ্ত জ্ঞানের বীজ অঙ্কুরিত
না হবে ততদিন এ আলোকময় পৃথিবীতে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকে যা অন্ধচক্ষু ব্যক্তির
ন্যায় বিচরণ করে সত্ত্বগণকে যদিও সূর্যের আলো চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এখানে সংক্ষেপে কিছু শীল বা আত্মগৌরব অধিকার বিষয়ে আলোকপাঠ করার চেষ্টা করব।
সত্ত্বগণ বিবিধ ঘটনা দর্শন করে বিশেষ করে মানবগণ নিজেকে উপলদ্ধি করতে সক্ষম বা
সামর্থ্য হয় যখন কারোর বীভৎস নাটক (আয়নার সামনে নিজেকে দেখার ন্যায়) দেখে
পরিবর্তনমুখী হওয়ার ইতঃস্তত হয়। আত্মমর্যাদা দর্শন করে বিপরীতমুখী হয়। যাকে বলে
সংবেগ। এই সংবেগ দ্বারা মানুষ অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারে। যেমন-- জরা, ব্যাধি, চ্যুতি, মৃত্যুর পর অপায় ভয়, অতীত জন্মের খারাপ কর্মের
বিপাক দুঃখ, ঈপ্সীত বস্তুর অলাভে দুঃখ, বর্তমানে নিজের তথা পরিজনের আহার অন্বেষণ দুঃখ। এই অষ্ট আদীনব মানবের
পিছু নিয়ে সর্বদা আঘাত করে। এই অষ্ট দুঃখ কারোর দ্বারা সৃষ্টি নয় যে অন্যের
মাধ্যমে পরিচালিত হয়ে কাউকে নিরাশ করে দুঃখ সাগরে পতিত করবে? তাই ধীমানেরা ইহার সামর্থ্য উপলদ্ধি করে শীলের প্রতি মায়া মমতা বৃদ্ধি
পোষণ বা বর্ধিত করেন। শীল পালেনর আনন্দ সুখ অনুভব করেন। এ অনুভবের দ্বারা স্বীয়কে
পর্বতসম উচ্চতায় নিয়ে যান যা পণ্ডিতব্যক্তি কর্তৃক প্রশংসিত ও আচরণীয় বিষয় বা
ধর্ম। শীল বিশ্লেষণে দেখা যায় শীলন বা অনুশীলন বা অভ্যাসই তার প্রকৃতি
বিরতি বা পণ- বিরতি হওয়া
বা অধিষ্ঠান করা। কিসে বিরত হওয়া? পাপে
বা অকুশলে রমিত না হওয়া। অনৈতিকের প্রতি চিত্তের বিমূখীভাব উৎপন্নই বিরতি। পৃথিবীতে
মহামানব জগতে দুঃখী সত্ত্বগণকে উদ্ধারকারী রূপে যাঁরা অবতীর্ণ বা আবির্ভাব হয়েছেন
তাঁদের প্রত্যেকেরই উক্ত বাণী শুনিয়েছেন ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন এবং সহায় সম্বল
বহন করেছেন। এই বিরতি তিন প্রকার, যথা- সম্প্রাপ্ত বিরতি,
সমাদান বিরতি ও সমুচ্ছেদ বিরতি।
সম্প্রাপ্ত
বিরতি: জীবগনের জীবনী শক্তি বা
জীবিতেন্দ্রিয়কে রক্ষা করার জন্য আহারের প্রয়োজন হয়। এই আহার সন্ধানের ক্ষেত্রে
বিবিধ উপায় অবলম্বন করে উক্ত শক্তিকে রক্ষা ও দৃঢ় করে থাকে। সত্ত্বগণ যেমন নানাকায়
তেমনি রুচিও ভিন্ন ভিন্ন হয়। কায় ও রুচি ভিন্ন হলেও সাধারণত পাঁচ প্রকার আহার
বৌদ্ধশাস্ত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন কবলীকৃত আহার, স্পর্শাহার, চেতনাহার, সংজ্ঞাহার, বিজ্ঞানাহার। জীবনীশক্তিকে
সুরক্ষা ও কার্য পরিচালনার জন্য যে বিভিন্ন উপায়ে আহার (বিশেষ করে কবলীকৃত আহার)
সন্ধান প্রয়োজন সে খাদ্য জোগানোর ক্ষেত্রে কায়-বাক্য প্রয়োগ হয়। প্রয়োগের সময়
বিভিন্ন কৌশল পন্থা অবলম্বন হয়। বাক্যের মাধ্যমে সত্য বা অসত্য, মৃদু বা কর্কশ, বিভেদ বা মিলন বাক্য উচ্চারণ
করি। বাক্য সাধারণত দুই প্রকার, যথা- মিথ্যাবাক্য ও
সত্যবাক্য। মিথাবাক্য আবার চারি প্রকার। যথা- মিথ্যাবাক্য, পিশুনবাক্য, কর্কশবাক্য, বৃথাবাক্য।
সত্যবাক্য: চারি মিথ্যা বাক্যের বিপরীত সত্যবাক্য। যেমন- সত্যবাক্য, মিলনাত্মকবাক্য, মধুরবাক্য, মৈত্রীযুক্তবাক্য অর্থপূর্ণবাক্য।
জীবিকা: মানবগণ জীবিকা নির্বাহের জন্য যেমন বাক্য প্রয়োগ করে
তেমনি শারীরিকও প্রয়োগ প্রয়োজন হয়। জীবন ধারণে প্রাণী (মানব) যে বিভিন্ন উপায় বের
করে থাকে সে উপায় সহায় সম্বল স্বরূপ টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ, এক কথায় পার্থিব উৎপাদন বা উপার্জন
করে জীবিকা নির্বাহ করে। সে উপার্জন বুদ্ধের প্রশংসিত কিংবা নিন্দিত দ্বিবিধ উপায়।
নিন্দিত উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করা হচ্ছে প্রাণী হত্যা বা প্রাণী ব্যবসা করা বা,
চুরি করা, মাংস ব্যবসা, বিষ বা নেশা দ্রব্যাদি ব্যবসা করা। এই পাঁচ প্রকার বুদ্ধের নিন্দিত
জীবিকা। বুদ্ধের প্রশংসিত উপায় হল চাকরি করা, কৃষি কাজ
করা, প্রাণীগনের ক্ষতিকারক নয় এমন ব্যবসা করা।
মোটকথা
জীবিকা নির্বাহের বা যেকোন সময় পাপ, ক্ষতি, দুষ্কৃতি করার উপায় বা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নিজের জ্ঞাতিকুল, শিক্ষার মান, নিজের বয়স, বিবেচনা করে তথাপি ত্রিরত্নের প্রতি বিশ্বাস ও ভক্তি, পাপের প্রতি লজ্জা (আমি যদি এই খারাপ কাজ করি কেউ দেখলে আমাকে পাপি বলে
সম্বোধন করবে, আমার সন্তানেরা লজ্জিত হবে পাপির সন্তান
বলে ইত্যাদি) দুঃখের প্রতি ভয় উৎপন্ন করে (যেমন রাজারা অপরাধীদের যেভাবে শাস্তি
দেয় আমাকে ঔ শাস্তি পেতে হবে, মৃত্যুর পর চারি অপায়ে
উৎপন্ন হলে অশেষ দুঃখ ভোগ করতে হবে, কর্ম ও কর্মফলের
প্রতি বিশ্বাস রেখে) সর্বোপরি মানবকুলে জন্মগ্রহণ করলেও জন্মাবধির, বোবা, মস্তিষ্কবিকৃত, বিকলাঙ্গ হয়ে জন্মগ্রহণ করতে হবে) এই মনোভাব রেখে পাপ কাজ অন্যায় কাজ
হতে বিরত বা চিত্তের বিমুখীভাব উৎপ করাকে সম্প্রাপ্ত বিরতি শীল বলে। যেকোন ব্যক্তি
এই শীল পালন করতে পারে। সমাদান বিরতি শীল- ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের সময় প্রার্থনার
মাধ্যমে যে শীল গ্রহণ করে প্রতিজ্ঞা করা হয় আজ হতে আমি পঞ্চশীল নীতি আমার দ্বারা
ভঙ্গ হবেনা এইরূপে অধিষ্ঠান করাকে সমাদান বিরতি শীল বলে।
সমুচ্ছেদ
বিরতি শীল- নিরনুশয় চিত্তের যে দুশ্চরিতে
বিরতি অর্থাৎ প্রত্যেক সত্ত্বগণের কতগুলো অকুশল চৈতসিক থাকে যেগুলো চিত্ত সন্ততিতে
সুপ্ত অবস্থায় থাকে, সেগুলো অনুরূপ
আলম্বনাদি পেলে জাগ্রত হয়ে কার্যে রূপান্তরিত হয়। সেই সুপ্ত অনুশয় চৈতচিক
(কাম-রাগানুশয়, ভব-রাগানুশয়,
প্রতিঘানুশয়, মানানুশয়, দৃষ্টানুশয়,
বিচিকিৎসানুশয়, অবিদ্যানুশয়) এগুলোকে
দান-শীল-ভাবনা বা শীল-সমাধি-প্রজ্ঞা অনুশীলেনর মাধ্যমে আংশিক কিংবা পুরোপুরিভাবে
ধ্বংস করে দুশ্চরিতে বিরতিই হল সমুচ্ছেদ বিরতিশীল।
চরিত ও বারিত
রূপে শীল দুই ভাগে দেখানো হয়েছে। যা করণীয় বা কর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে তা চরিত শীল ।
যা নিষেধাজ্ঞার অন্তর্গত তা বারিত শীল। এই দুটিকে আমরা বিধিনিষেধ ধরে নিতে পারি।
তারতম্য ভেদে শীল হীন, মধ্যম,
উত্তম তিনভাগে বিভক্ত করা যায়। হীনশীল পালনকারী ব্যক্তি অহংকারে
স্ফীত হয়। তার আত্ম প্রশংসা করে এবং অপরকে নিন্দায় ক্লিষ্ট থাকে। মধ্যম শীল পালন
হচ্ছে পুণ্য ফলের আশা বা আত্মমুক্তির জন্য পালিত হয়। উত্তম শীলন পালন হচ্ছে সমগ্র
বিশ্বের প্রতি অনুকম্পা করুণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিষ্কামভাবে পালিত অমলিন লোকোত্তর
শীল।
হীন ধম্মং ন সেযেব্য পমাদেন ন
সংবাসে,
মিচ্ছাদিট্ঠ ন সেযেব্য ন সিযা
লোকা বদ্ধনো।---- ধম্মপদ
হীন ধর্ম
সেবা না করা, প্রমাদের সহিত বাস না
করা। মিথাদৃষ্টি সম্পন্ন লোকের সেবা না করা, জন্মান্তরের
বৃদ্ধি না করা। অর্থাৎ নিচু ধর্ম, হীন ধর্ম, পাপ ধর্ম আচরণ না করা। যে ধর্ম আচরণে, প্রতিপালেন,
ধারণে মনে দুঃখ পেতে হয়, কষ্ট ভোগ করতে
হয় বিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাছে নিন্দিত হতে হয়, সমাজে মাথা
নিচু করে থাকতে হয় এমন ধর্ম পালন না করা। প্রমত্তের সহিত জীবন অতিবাহিত না করা।
প্রত্যেক ব্যক্তি, পরিবার, সমাজে
এভাবে বিশেষ করে সম্প্রাপ্ত শীল ও সমাদান শীল পালন করার উৎসাহ আগ্রহবোধ সৃষ্টি
করতে হবে। তবে ব্যক্তি পরিবার গ্রাম সমাজ রাষ্ট্র জাতি মেল বন্ধনে আবদ্ধ হবে।
একটি
কথা বলে শেষ করব, কোন ব্যক্তি সে কোন এক পরিবারের সদস্য,
পরিবারের সদস্য মানে গ্রামের সদস্য,
গ্রামের সদস্য মানে সমাজের সদস্য, সমাজের সদস্য মানে
জাতির সদস্য, জাতির সদস্য মানে তিনি একজন রাষ্ট্রের
সদস্য। এবার ভাবুন সে ব্যক্তি যদি খারাপ আচরণ বা স্বভাবের হয় তবে
পরিবার-গ্রাম-সমাজের-জাতির-রাষ্ট্রের একজন খারাপ সদস্য পাবে। অপরদিকে সে একই
ব্যক্তি যদি ভালো আচরণ বা স্বভাবের হয় তবে পরিবার একজন ভালো সদস্য পাবে, গ্রামের, সমাজের, জাতির
রাষ্ট্রের একজন ভালো সদস্য পাবে। প্রত্যেক ব্যক্তি ভালো হলে সকল উন্নতির পথে একধাপ
এগিয়ে যাবে। অন্য কথা নাই বললাম। এবার নিজেই ঠিক করুন আপনি আপনার সন্তান তথা চার
পাশে কোন পথের অনুসারী হতে চান?
? লেখক পরিচিতি : শ্রীমৎ দব্ব ভিক্ষু, রাজবন বিহার, রাঙামাটি। লেখকের এ প্রবন্ধটি ২০১৯ সালে “অনাবরণ” নামক স্মরণিকায় প্রকাশিত হয়।





