অদৃশ্য ও মনোরম একটি মহাদ্বীপ : শ্রীমৎ শ্রদ্ধামিত্র ভিক্ষু

এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যেসব সত্ত্ব বা প্রাণী রয়েছে তাদের মধ্যে মানুষই হল সর্বশ্রেষ্ঠ। সকল প্রাণী হতে সর্বাধিক মননশক্তি সম্পন্ন ও যুক্তিবাদী প্রাণীও হচ্ছে মানুষ। মানুষ ব্যতীত অন্য কোনো প্রাণীর পক্ষে চিন্তা করে চতুরার্যসত্যকে (অর্থাৎ দুঃখ, দুঃখের কারণ, দুঃখ নিরোধ ও দুঃখ নিরোধের উপায়) উপলব্ধি করা বা অনুধাবন করা কখনো সম্ভব নয়। কেননা অপায়ভূমির সত্ত্বগণ (অর্থাৎ নিরয়লোক, তির্যকযোনি প্রেতবিষয় ও অসুরকায়) মহা দুঃখ-যন্ত্রণায় সর্বদা নিমগ্ন। যারফলে দুঃখ নিবৃত্তির উপায় সম্বন্ধে চিন্তা বা গবষেণা করার সময়, শক্তি ও ফুরসত তাদের কাছে নেই। অপায়ের সত্ত্বগণ দুঃখ ভোগ করে ঠিকই কিন্তু তাদের দুঃখ ভোগের কী কারণ সেটা তারা বুঝতে পারে না। অন্যদিকে রূপ ও অরূপ ব্রহ্মলোকের সত্ত্বগণের জীবনে সুখের পরিমাণ এতোই বেশি যে দুঃখ-মুক্তির আবশ্যকতা কী তাদের সেটাও উপলব্ধি হয় না। পক্ষান্তরে মানুষ সুখ-দুঃখকে সমানভাবে উপলব্ধি করতে পারে বুঝতে পারে এবং দুঃখ-মুক্তির পথ অন্বেষণ করতে পারে।
বৌদ্ধদর্শন মতে পৃথিবীতে চারটি মহাদ্বীপ রয়েছে সেগুলো সর্ম্পকে আলোচনা করলে আমার মনে হয় বিরাট একটা বই না হলেও মাঝারি সাইজের বই হয়ে যাবে। চারটি মহাদ্বীপ থেকে আমি কেবল একটি মহাদ্বীপ সর্ম্পকে আলোচনা করব। কেননা এরকম ছোট্ট প্রবন্ধের মধ্যে চারটি মহাদ্বীপের জায়গা নেই।
এ চারটি মহাদ্বীপের মধ্যে তিনটি মহাদ্বীপই অদৃশ্য বা খালি চোখে দেখা যায় না। বলা যেতে পারে এক প্রকার লৌকিক বিশ্বে অলৌকিক দেশ। কিন্তু পৃথিবীটা লৌকিক হলেও অনেক অলৌকিক বিষয় নিয়ে ভরপুর। যেগুলো আমরা খালি চোখে দেখতে পায় না। তার মধ্যে কতগুলো বিষয়কে দেখতে হলে সরাসরি টেলিস্কোপ-মাইক্রোস্কোপ অথবা কোনো স্কোপ দিয়েই হবে না। দেখতে হলে আপনাকে দিব্যচক্ষুর অধকিারী হতে হবে। খালি চোখে দেখা যায় কেবল একটি মহাদ্বীপ আর সেটা হচ্ছে জম্বুদ্বীপ। যদিও এ রমরমা আধুনকি যুগে অলৌকিক ব্যাপারগুলোকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়া হয় না। তবুও আমার মনে হয় অলৌকিক বলতে সত্যি কিছু আছে। তবে বর্তমানে লৌকিক জিনিসগুলোতে লোকজন প্রায় অলৌকিক ফ্লেভার মিশিয়ে দেয় বলে অলৌকিক বিষয়গুলো তার স্বতন্ত্রটা হারিয়ে মানুষের কাছে আজ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে।
তারপরও আমার আলোচ্য বিষয় হচ্ছে অদৃশ্য একটি মহাদ্বীপকে নিয়েই। তাই হয়ত বিজ্ঞানের চরমপন্থী ব্যক্তিগণ আমার বিষয়টাকে আজগুবি মনে করতে পারেন। কল্প কাহিনী কিংবা বানানো গল্প মনে হতে পারে। তবে আপনার যায় মনে হোক না কেন বৌদ্ধধর্ম কিন্তু আপনাকে এটি পরষ্কিার বলে দেয় যে আপনি যা বিশ্বাস করছেন না বা মিথ্যা বলে মনে হচ্ছে অথবা যে বিষয়টি আপনাকে বলা হলো তার প্রতি আপনার সন্দেহ এসে যাচ্ছে তাহলে আপনি সেটা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। বৌদ্ধধর্মের যে কোনো বিষয়কে জানার জন্য অবশ্যই উপায় রয়েছে। সুতরাং আপনার উচিত হবে আমার বিষয়টাকে সরাসরি বিশ্বাস স্থাপন না করে অথবা বিশ্বাস না হলে হুট করে আবর্জনার মতো ফেলে না দিয়ে একজন পণ্ডিতের মতো বিচার করা এবং সত্যতা জানার জন্য কাজে নেমে পড়া।
যাইহোক, একত্রিশ লোকভূমির মধ্যে মনুষ্যলোক একটি কামসুগতি ভূমি। এই ভূমির মধ্যে মানুষের বসবাসের উপযোগী চারটি মহাদ্বীপ রয়েছে আর সেগুলো হচ্ছে জম্বুদ্বীপ, পূর্ববিদেহ, অপরগোয়ান এবং উত্তরকুরু। জম্বুদ্বীপের মধ্যে বুদ্ধ, পচ্চকে বুদ্ধ, মহাশ্রাবক ও চক্রবর্তী রাজার উৎপত্তিস্থান হওয়ায় অতিরমনীয় হয়। বাকি তিনটি মহাদ্বীপ যেমন পূর্ববিদেহ, অপরগোয়ান এবং উত্তরকুরু দিব্য বা অলৌকিক অবস্থায় থাকে এই চারটি মহাদ্বীপের মধ্যে মানুষের কর্মের তারতম্য অনুসারে বসবাসের জন্য স্থানসমূহ নির্দিষ্ট হয়।
উত্তরকুরু মহাদ্বীপ সর্ম্পকে দীর্ঘনিকায়ে আটানাটিয়া সূত্রের টীকা ও বিনয়পিটকের সারত্থদীপনী টীকা অনুযায়ী বলা হয়েছে, মানুষের বসবাসের কাহিনীর কথা এভাবে বিশদভাবে বলা হয়েছে যে, উত্তরকুরুতে বসবাসরত মানুষের যত প্রকার পুণ্য-সুখ-সম্পত্তি আছে সেগুলো সমস্তই তাদরে পুণ্য প্রভাবে উৎপন্ন হয়ে থাকে জনপদগুলো চিলেকোঠার মতো মনোরম শাখা-প্রশাখা ও সবুজ ঘন পাতায় আচ্ছাদিত গাছগাছালাটিতে পরিপূর্ণ। সেগুলো তারা গৃহের প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করে। তারা সেই বৃক্ষরে নীচে সুখে স্বাচ্ছন্দে অবস্থান করে। অন্যান্য গাছপালা ও লতাপাতাগুলোও সেখানে অতি সুন্দর রূপে উৎপন্ন হয়ে থাকে। সেই মহাদ্বীপটি সবসময় ফুলে-ফলে টইটম্বুর। সেখানকার জলাশয়সমূহও বিকশিত পদ্ম-কুমুদের সুগন্ধে সবসময় মুখোরিত। সেই পুষ্পের সুগন্ধ অহোরাত্র চারদিকে প্রবাহিত হতে থাকে।
উত্তরকুরুর মানুষেরা বেশি লম্বাও নয়, বেশি খাটোও নয়। স্বভাবতই তারা সুন্দর চেহারাসম্পন্ন। তাদের সুস্বাস্থ্য-বল-পরাক্রম ও শরীরের সৌন্দর্য শেষ বয়সেও অটুট থেকে যায়। তারা উদ্যম-উপজীবি বলে কৃষি বাণিজ্যা ইত্যাদির দ্বারা আহার অন্বেষণ জনিত দুঃখ তাদের পেতে হয় না। কাজেই চাকর-চাকরানি এবং কর্মচারী ইত্যাদিরও তাদের কোনো প্রয়োজন হয় না। শীত-উষ্ণ, পোকামাকড়, মশা-মাছি দুষিত বায়ু, প্রখর সূর্যতাপ, সরীসৃপ এবং হিংস্র জন্তু-জানোয়ার ইত্যাদির উপদ্রব সেখানে নেই। এখানে গ্রীষ্ম ঋতুর শেষ মাসে প্রাতঃকালে যেমন সমান শীত এবং সমান উষ্ণতা, সেখানেও সেইরূপ সমান শীতের তীব্রতা ও সমান উষ্ণতা ঋতুগুলোতে সবসময় বিরাজ করে। তাদের কোনো প্রকার উপঘাত বা শারীরিক কষ্ট পেতে হয় না। তারা কাঠহীন, ক্ষুদ-কুঁড়া-তুষবিহীন বিশুদ্ধ সুগন্ধ শালি ধূমবিহীন অঙ্গারের আগুনে পাক করে ভোজন করেন। সেখানে জোতিপাষাণ নামক এক প্রকার পাষাণ বা পাথর আছে। তিনটি পাষাণ রেখে তার উপর চাউলের পাত্র স্থাপন করা হয়। জ্যোতিপাষাণ হতে তেজোধাতু উৎপন্ন হয়ে সেই ভাত পক্ব হয়ে যায়। সূপ বা ব্যঞ্জন পাক করার সময়ও একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়। ভোজনকারীদের মনে অভিরুচি অনুযায়ী রসের আস্বাদ অনুভূত হয়। যারা সেই শালি বা অন্ন ভোজন করে তাদের কুষ্ঠ, গণ্ড, চুলকানি, শ্বাস, অপমার (মৃগী রোগ), কাশী ও জ্বর ইত্যাদি কোনো প্রকার রোগ উৎপন্ন হয় না। তাদের মধ্যে কোনো প্রকার কৃপণতা নেই। সেখানে যারা ভিক্ষা করতে যায়, তাদেরকে দান করে। বুদ্ধ, পচ্চেকবুদ্ধ, ঋদ্ধিমানেরা সেখানে গিয়ে পিণ্ড গ্রহণ করে থাকেন। উত্তরকুরুবাসীদরে মধ্যে কুঁজ, কানা, খঞ্জ-পক্ষাঘাত রোগাগ্রস্থ, বিকলাঙ্গ ও বিকলেন্দ্রিয় এরকম কোনো মানুষ নেই।
স্ত্রীলোকেরাও দেখতে অতবেশি খাটো, লম্বা, জিরজিরে দেহ, রোগা-পাতলা, অস্বাভাবিক কাল ও সাদা নয় । তারা শারীরিক সৌর্ন্দয্যে অনিন্দ্যসুন্দরী এবং সৌভাগ্যবতী। সেই পরমা-সুন্দরীদের আঙ্গুল লম্বা, নখ তাম্র বর্ণ, স্তন অবলম্বতি নয় (লম্বা হয়ে ঝুলে পড়ে না), শরীরের মধ্যভাগ ক্ষীণা অর্থাৎ লম্বা ও সরু কোমর বিশিষ্টিা, চোখ জোড়া বিশাল, শরীর সুকোমল, উরু সুঠাম, দন্ত শুভ্র (ধবধবে সাদা), নাভী গম্ভীর, জঙ্ঘা ছোট, সুর্দীঘ নীল লতার তুল্য কেশ, কান অবদুলিত, হালকা লোম সম্পন্ন হয়। তারা মধুরভাষিণী, সাদর-সম্ভাষণে নিপুণা ও নানা অলঙ্কারে বিভূষিত হয়ে বিচরণ করে। তাদের অবয়ব দেখতে ষোল বছর বয়সী যুবতীর মতো দেখায়। পুরুষদের সর্বদা পঁচিশ বছর বয়সী তড়তাজা যুবকের মতো হয়ে থাকে। পুরুষেরা সকল সময়ে স্ত্রীর প্রতি আসক্ত হয় না। এটি তাদের স্বভাব বা ধর্মতা। পুরুষেরা এক সপ্তাহ কালমাত্র কাম তাড়নায় আসক্ত হয়ে এদিক সেদিক বিচরণ করে থাকে। তারপর কামরাগ বিহীন হয়ে যার যার গন্তব্যে চলে যায়। এখানকার ন্যায় উত্তরকুরুতে গর্ভধারণ ও গর্ভরক্ষা করার জনিত কোনো প্রকার দুঃখ ভোগ করতে হয় না। রক্তিমবর্ণ থলে হতে সোনার প্রতিমা বের করার ন্যায়, সন্তান রক্ত পুঁষের দ্বারা অসংমিশ্রিতভাবে সুখে ভূমিষ্ঠ হয়ে থাকে। এটি সেখানকার ধর্মতা। সন্তানের মা কিন্তু পুত্র হোক বা কন্যা হোক ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর নিজের সঙ্গে রাখে না। সেখানে সন্তান রেখে দেওয়ার নির্দিষ্ট একটি স্থান রয়েছে। ভূমিষ্ঠ সন্তানকে সেখানে রেখে দিয়ে নিরপেক্ষ-ভাবে চলে যায়। সন্তান সেখানে শুয়ে থাকে। যে কোনো স্ত্রী-পুরুষ সন্তানের এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে নিজের আঙ্গুল চোষণ করতে দেয়। সন্তানদের কর্মবলে তা হতে ক্ষীর বের হয়। সেই ক্ষীর পান করে সন্তানেরা জীবিত থাকে। এভাবে জীবিত থেকে কিছুদিন পর বলবান হয়ে উঠলে বালিকারা মেয়েদের সঙ্গে, বালকেরা পুরুষদের সঙ্গে মিশে যায়। সেখানে কল্প বৃক্ষ হতে তাদের বস্ত্রাভরণসহ ইত্যাদি উৎপন্ন হয়ে থাকে। নানা রঙে বিচিত্র সূক্ষ্ম সুকোমল বস্ত্রসমূহ, কল্প-বৃক্ষে ঝুলতে থাকে। নানা প্রকার রশ্মি জালের দ্বারা সমুজ্জ্বল, বিবিধ বর্ণ রত্নদ্বারা সেলাই করে নানা রকম কারুকার্য খচিত মাথায় মুকুট, গ্রীবার ও বাহুর অলঙ্কার এবং সুর্বণময় পাদুকাসমূহ কল্প বৃক্ষের আগায় অবলম্ববিত হয়ে থাকে। সেখানে বীণা, মৃদঙ্গ করতালিসহ ইত্যাদি শব্দের নিনাদে এবং শঙ্খ-বংশী আদি তূর্য ধ্বনির বস্তু সকল কল্পবৃক্ষে ঝুলতে থাকে। সেখানে নানা জাতির ফলন্ত বৃক্ষ আছে তাতে কলসী প্রমাণ বৃহৎ ফলসমূহ ফলিত হয়। সে সমস্ত ফল খুবই রসালো। সেই ফল খেয়ে তারা সাতদনি পর্যন্ত একটানা জীবন-যাপন করতে পারে। ফল খেয়ে সাত দিনের মধ্যে ক্ষুধা পিপাসায় ক্লান্ত হয় না।
সেখানকার নদীর জলও সুবিশুদ্ধ। নদীর ঘাটসমূহ সুন্দর রমণীয়, কর্দ্দমবিহীন এবং বালুকাযুক্ত। সেখানে শীত ও উঞ্চতার আধিক্য নেই। নানা রকম জলজ পুষ্পে সুগন্ধে সর্বত্র বিমোহিত হয়ে থাকে এবং সর্বদা সুগন্ধ বায়ু প্রবাহিত হয়। সেখানে কাঁটাযুক্ত ও কর্কশবৃক্ষ লতাদি জন্মে না। কাঁটাবিহীন ফল-পুষ্প ভারে অবনত বৃক্ষ সকল জন্মে থাকে। চন্দন এবং নাগেশ্বর বৃক্ষ হতে স্বয়ং নির্যাস বের হতে থাকে। যারা স্নান করবার ইচ্ছা করে তারা সকলের কাপড়-চোপড় খুলে এক স্থানে সাজিয়ে গুছিয়ে স্তুপাকার করে রাখে। যারা প্রথমে স্নান করে উঠে তারা বরাবর উপরের কাপড় নিয়ে পরিধান করে। "এটা আমার, এটা অপরের" বলে তাদের সেরূপ ভাব নেই। একের বস্তু অপরের গ্রহণ করলেও এর জন্য তাদের মধ্যে কোনো প্রকার কলহ-বিবাদ উদ্ভব হয় না। তারা সপ্তাহ মাত্র কামরতি খেলায় নিরত থাকে। তারপর কাম রতিবিহীন মানুষের ন্যায় হয়ে বিচরণ করে থাকে। যে বৃক্ষে শয়ন করতে ইচ্ছা করে সেখানেই তারা শয্যা লাভ করতে পারে।
তাদের মধ্যে কারোর মৃত্যু হলে রোদন ও অনুতাপ করে না। মৃত শরীর সুগন্ধি ইত্যাদির দ্বারা মণ্ডিত করে নিক্ষেপ করে থাকে। নিক্ষেপ করা মাত্রেই এক প্রকার পাখি এসে মৃতদেহ দ্বীপান্তরে নিয়ে যায়। সেজন্য সেখানে শ্মশান অথবা অশুচি স্থান নেই। সেখান হতে মৃত্যুবরণ করে কেউ নরক, তির্যকযোনি ও প্রেলোকে উৎপন্ন হয় না। কারণ স্বভাবতই তাদের পঞ্চশীল পালেনর জন্য পুণ্যের ফলে দেহান্তে স্বর্গবাসী হয়। তাদের পরমায়ু হাজার বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। উল্লেখিত সকল বিষয় পঞ্চশীলের ন্যায় স্বাভাবিক। উত্তরকুরু অধিবাসীদের আচরিত শীলকে প্রকৃতি শীলও বলা হয়। -বিনয়পিটকের সারত্থদীপনী টীকা-১ আবার দীর্ঘনিকায় মহাসতিপট্ঠান সূত্র অর্থকথা বর্ণনায় বলা হয়েছে, কুরুরাজ্যবাসী গম্ভীর ধর্ম ভাষণ বুঝতে সক্ষম। কুরুরাজ্যবাসী ভিক্ষু, ভিক্ষুণী, উপাসক, উপাসিকা ঋতুর যথোপযোগী ছিলেন। তাদের রাজ্যে ঋতুর উপযুক্ত পরিবেশে তারা সর্বদা পরশিুদ্ধ দেহ ও পরিশুদ্ধ চিত্তসম্পন্ন ছিল। সেই পরিশুদ্ধ দেহ-মনের কারণে প্রজ্ঞাবলে তারা গম্ভীর ধর্মকথা বুঝতে সমর্থ ছিল। তাই ভগবান তাদের গম্ভীর দেশনা বুঝতে পারার সার্মথতা দর্শন করে একুশটি স্থানে (উপায়ে) কর্মস্থান (ভাবনা প্রণালী) দ্বারা তাদেরকে অরহত্বে প্রতিষ্ঠিত করতে এই গম্ভীর অর্থসম্পন্ন মহাস্মৃতিপ্রস্থান সূত্র দেশনা করেন।
কুরুরাজ্যে ভিক্ষু, ভিক্ষুণী, উপাসক, উপাসিকা এই চতুর্বিধ পরিশুদ্ধ পরিষদ সতিপট্ঠান ভাবনায় নিযুক্ত থেকে সর্বদা জীবনযাপন করত। যদি কোনো মহিলাকে জিজ্ঞাসা করা হলে বলত, মা, তুমি কত প্রকার সতিপট্ঠানে মনোযোগী হয়েছ?" তখন মহিলা কোনোটাই করছি না এরূপ বললে তাকে বলা হতো- এটি খুবই গর্হিত তোমার জীবন অর্থহীন। তুমি জীবিত হয়েও মৃত সদৃশ। অতএব, তুমি এখন এভাবে সময় নষ্ট করো না।" এভাবে উপদেশ দিয়ে যে কোনো সতিপট্ঠান শিক্ষা দিতেন। আবার যদি কেউ বলতো- আমি অমুক সতিপট্ঠান অনুশীলন করছি তখন সাধু সাধু সাধু বলে তাকে প্রশংসা করে বলত, “তোমার জীবন শুভ। তুমিই মানব নামের যোগ্য। সম্যক সম্বুদ্ধের উৎপত্তি তোমাদের জন্যই।" কেবল মনুষ্য জাতি নহে তাদের আশ্রয়ে থাকা তির্যক প্রাণীরা পর্যন্ত এই সতিপট্ঠানে মনোযোগী ছিল। এ সম্পর্কে একটি বিশেষ কাহিনী আছে ঠিক এরকম-এক নৃত্যকার একটি তোঁতা পাখি ধরে তাকে শিক্ষা দিয়ে সাথে নিয়ে ভ্রমণ করছিল। সে ভিক্ষুদের আশ্রয়ে কিছুদিন বাস করে চলে যাওয়ার সময়ে সেই তোঁতা পাখিটিকে মুক্তি দিয়ে রেখে গেল। এক শ্রামণেরী তাকে গ্রহণ করে পালন করতে লাগলেন। তার নাম রাখলেন বুদ্ধরক্ষিত। একদিন সম্মুখে বসে থাকতে দেখে মহাথেরী পাখিটিকে ডাকলেন, “বুদ্ধরক্ষিত।, কেন আর্য?” অস্থি ভাবনায় মনোযোগ করছ তো? না আর্য। বন্ধু, প্রব্রজিতদের নিকটে বাস করেও উত্তমভাবে বসবাস যদি না কর, তবে কিসের মনোসংযোগ ইচ্ছা করো? বন্ধু, তোমার অন্য বেশী শিক্ষা করতে হবে না। তুমি কেবল 'অস্থি অস্থি” বলে আবৃত্তি করো।" সে থেরীর উপদেশ পালন করে 'অস্থি অস্থি” বলে আবৃত্তি করে করে বিচরণ করতে লাগলো।
একদিন সকালে তোরণের উপর বসে বুদ্ধরক্ষতি গায়ে বাতাস নিচ্ছিল আর রোদও পোহাচ্ছিল এমন অবস্থায় এক বাজপাখি শো মেরে নখ পঞ্জরের ঝাপটায় তাকে ধরলে সে "কিরি কিরি” শব্দ করলো। শ্রামণেরীগণ সেটি শুনে থেরীকে বললেন, আর্য, বুদ্ধরক্ষিতকে বাজপাখি ধরেছে। তাকে মুক্ত করবো কী? থেরী বলল, মুক্ত করো। তারা ঢিল ছুঁড়ে ও লাঠি দ্বারা ভয় দেখিয়ে তাকে মুক্ত করে থেরীর সামনে রাখল। তখন থেরী পাখিটিকে জিজ্ঞাসা করল, “বুদ্ধরক্ষতি, বাজপাখি যখন তোমাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছিল তুমি তখন কি চিন্তা করছিলে?” আর্য, অন্যকিছু চিন্তা না করে ভাবছিলাম, অস্থিপঞ্জর অস্থিপঞ্জরকে গ্রহণ করে চলে যাচ্ছে" কয়টি স্থানে চিত্তকে মনোনিবেশ করছিলে? র্আয, কেবলমাত্র অস্থিপঞ্জরই চিন্তা করেছিলাম। তখন থেরী তাকে এভঅবে বলল, “সাধু সাধু সাধু বুদ্ধরক্ষিত, ভবিষ্যতে এটি তোমার ভবক্ষয়ের হেতু হলো।" এভাবে কুরুরাজ্যে তির্যক প্রাণী পর্যন্ত সতিপট্ঠানে মনে-প্রাণে সংযুক্ত ছিল। -দী.নি.অট্ঠ. ৯.৩৭৩
ধর্মপদ অর্থকথা বর্ণনায় উল্লেখ আছে যে, বোধি লাভের প্রথম দিকে ভগবান বেরঞ্জ ব্রাহ্মণের দ্বারা নিমন্ত্রিত হয়ে বেরঞ্জায় গিয়ে পঞ্চশত ভিক্ষুর সঙ্গে বর্ষাবাস যাপন করছিলেন। বেরঞ্জ ব্রাহ্মণ মারের আর্বতনী মায়ায় আবদ্ধ হয়ে একদিনও বুদ্ধের প্রতি মন দিতে পারেন নি। বেরঞ্জায় দুর্ভিক্ষ হলে ভিক্ষুরা বেরঞ্জার ভিতরে ও পিণ্ডাচরণ করে পিণ্ডুপাত না পেয়ে অনেক কষ্টে পড়ে গেলেন। অশ্ব বণিকেরা প্রত্যক ভিক্ষুকে এক প্রস্থ এক প্রস্থ সিদ্ধ দানা ভিক্ষার ব্যবস্থা করেছিল। ভিক্ষুদের কষ্ট পেতে দেখে মহামৌদগল্যায়ন স্থবির ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন যে, ভিক্ষুরা মৃত্তিকার ওজঃ ভোজন করুক অথবা তখন তাদের পিণ্ডুপাতের জন্য উত্তরকুরুতে নিয়ে যাবেন (এইজন্য তিনি শাস্তার অনুমতি প্রার্থনা করেছিলেন কিন্তু শাস্তা তাহাতে সম্মত হননি) ।-ধ.প.অট্ঠ.৬.৮ একসময় শাস্তা দেব পরিষদের মধ্যে উপবিষ্ট হয়ে মাতাকে উদ্দেশ্য করে কুশলধর্ম, অকুশল ধর্ম অব্যাকৃত ধর্ম এইভাবে অভিধর্মপিটক দেশনা করলেন। এইভাবে তিনমাস নিরন্তর অভিধর্ম পিটক দেশনা করেছিলেন। দেশনাকালে ভিক্ষা সংগ্রহের সময় আমি প্রত্যাবর্তন না করা অবধি এই পরিমাণ ধর্মদেশনা করুক, বলে ঋদ্ধিযোগে নির্মিত বুদ্ধকে প্রতিষ্ঠিত করে প্রত্যহ হিমালয়ে এসে নাগলতার দাঁতন দিয়ে দাঁত মেঝে অনবতপ্ত হ্রদে মুখ ধুয়ে উত্তরকুরু হতে পিণ্ড আহরণ করে একটি মহাশালবৃক্ষের বেদীতে বসে আহারকৃত্য সম্পাদন করতেন। -ধ.প.অট্ঠ.১৪.২
অতীত জন্মে জোতিক শ্রেষ্ঠীর সঙ্গে কৃতপুণ্যকর্মা রমণী উত্তরকুরুতে জন্ম গ্রহণ করেছিল। দেবতারা তাকে নিয়ে এসে জোতিকের একটি শ্রীগর্ভে এনে বসতি স্থাপন করাল। আসার সময় সেই রমণী একটি তণ্ডুলনাড়ী ও তিনটি জোতিসম্পন্ন পাথরের টুকরো এনেছিল। যাবজ্জীবন সেই তণ্ডুলনাড়ীর দ্বারাই তাদের খাওয়া-দাওয়া করা হত। যদি তারা একশত শকটও তণ্ডুলের দ্বারা পরিপূর্ণ করতে ইচ্ছা করত, সেই তণ্ডুলনাড়ী একই প্রকার থাকত (একটুও কমত না)। রান্না করার সময় তণ্ডুলসমূহকে পাত্রে রেখে ঐ তিনটি পাষাণখণ্ডের উপর স্থাপন করত। পাথরের টুকরোগুলো তৎক্ষণাৎ প্রজ্বলিত হয়ে রান্নার কাজ করত আর শেষ হলে স্বয়ং নিভে যেত। এই লক্ষণ দেখে বুঝা যেত যে ভাত পক্ব হয়েছে। সূপাদি (ব্যঞ্জন) রান্না করার সময় এই পদ্ধতিই অনুসরণ করা হত।
এইভাবে জোতিক পাথরের টুকরো দ্বারাই তাদের আহার পরিপাক হতো। মণির আলোতেই তারা বাস করত, তাই অগ্নি বা প্রদীপের দীপ্তি সম্বন্ধে তাদের জ্ঞান ছিল না। জোতিকের এ রকম সম্পত্তির কথা সমগ্র জম্বুদ্বীপে ছড়িয়ে পড়ল। বহু লোক যানবাহনে আরোহণ করে তার দর্শনের জন্য আগমন করত। জোতিকশ্রেষ্ঠী আগন্তুক সকলকে উত্তরকুরুর তণ্ডুল রন্ধন করে ভোজন করাত। -ধ.প.অট্ঠ.২৬.৩৪

লেখক পরিচিতি :  শ্রীমৎ শ্রদ্ধামিত্র ভিক্ষু ২০১৮ সালে পালি শিক্ষাকোর্স সম্পন্ন করে বর্তমানে পড়াশেঅনায় নিয়োজিত রয়েছেন। (এ প্রবন্ধটি ২০১৯ সালে “অনাবরণ” স্মরণিকায় প্রকাশিত হয়েছে)
শেয়ার:

ফেইসবুক একাউন্ট দিয়ে কমেন্ট করুন।

ফটোগ্রাপি

জনপ্রিয় পোষ্ট

অনুসরণ করুন

facebook

ক্যাটাগরি

    প্রবন্ধ

সাম্প্রতিক পোষ্ট

অন্যান্য সাইট

  • Suttacentral
  • Kalpataruboi
  • Dhammatext

Featured Post

একটু সহানুভূতি : শ্রীমৎ অভিজ্ঞানন্দ ভিক্ষু

হে প্রভু—— মানবতার আকাশে আজ আগের মতো হয় না সোনালী স্নিগ্ধ ভোর জটপাকে কেটে যায় সময়ের প্রতিটি শাশ্বত প্রহর এ কেমন ঘোর, কী নিদা...

Pages

Theme Support

Need our help to upload or customize this blogger template? Contact me with details about the theme customization you need.