মানবিক পৃথিবী ও বুদ্ধের শিক্ষা : পুলক কান্তি বড়ুয়া



আমরা বুদ্ধের দেয়া উপদেশ বা দর্শনের সর্বজনীন কিছু মানবিক শিক্ষা আলোচনা করলে, মানবিক পৃথিবী রচনায় বুদ্ধের শিক্ষা থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রায়োগিক দিক খুঁজে পাবো। যেমন: মৈত্রী শিক্ষা। যখন ভালোবাসা, প্রেম, মানবিকতা, পরের হিত কামনা, সেবাপরায়ণতা, উদার মানসকিতা, নৈতিকতার মাঝে চিন্তা করতে পারনে তখনি বুদ্ধের ভাষায় আপনি মৈত্রীকে ধারণ করলেন, হয়ে উঠলেন মৈত্রীপরায়ণ। বুদ্ধের এই মৈত্রী শিক্ষার সারমর্ম হলো প্রেম ও খোলা মন।

আসলে, যখন আপনি মৈত্রীর দ্বারা অর্থাৎ প্রেম, ভালোবাসা, উদারতা, বন্ধুভাব, পরোপকারী মানসকিতা, অন্যের মতের প্রতি শ্রদ্ধাভাব এবং যুক্তির মধ্য দিয়ে নিজ যুক্তি প্রয়োগ করেন এবং তাতে ভরপুর থাকনে, তখন আপনি কদাপি কোনো নেতিবাচক শক্তিকে মনে স্থান দিতে পারনে না। এই মৈত্রী শিক্ষার মধ্যইে সকল শান্তি লুকিয়ে আছে। তথাগত বুদ্ধ নিজে যে সমস্ত মৈত্রীকর্মরে উদাহরণ দিয়েছেন, তন্মধ্যে কয়কেটি উদাহরণ দিলেই মৈত্রীর শিক্ষাটি আরও বেশী পরষ্কিার হয়ে উঠব। যেমনঃ

বু্দ্ধের সেবা: একটি ছোট বিহারে কয়েকজন ভিক্ষু থাকতেন। সেই বিহারে তিষ্য নামে একজন ভিক্ষু ছিলেন, যাঁর সঙ্গে কারো সদ্ভাব ছিল না। সবাই তাঁকে এড়িয়ে চলতনে। একবার তিনি ভীষণ চর্মরোগে আক্রান্ত হন। তাঁর গায়ের ক্ষত থেকে দুর্গন্ধ ছড়াতে লাগল। এ রকম যন্ত্রণাকাতর অবস্থায়ও তাঁর সেবায় কউে এগিয়ে এলো না। হঠাৎ বুদ্ধ সেই বিহারে আগমন করলে সেবা-শুশ্রুষাবিহীন মারাত্মক রোগাক্রান্ত সেই ভিক্ষুকে দেখেন। বুদ্ধ নিজেই সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সেবা করতে লাগলেন। তিনি সেবক আনন্দকে নিয়ে নিজে হাতে রোগীর ক্ষতস্থান পরষ্কিার করেন। তাঁকে স্নান করান। তারপর গা মুছে দিয়ে পরষ্কিার বিছানায় শুইয়ে দেন। বুদ্ধ বিহারের ভিক্ষুদের ডেকে রোগাক্রান্ত ভিক্ষুকে সেবা না করার কারণ জিজ্ঞাসা করেন। বুদ্ধ তাঁদের কাছ থেকে সমস্ত ব্যাপার শুনে খুব অসন্তুষ্ট হন। তিনি তাঁদের আচরণকে অনৈতিক ও অমানবিক বলে তিরষ্কার করেন এবং হিংসা-বিদ্বেষ পরিত্যাগ করার উপদেশ দেন। অতঃপর তিনি তাঁদের বললেন, দরিদ্রের সহায় হওয়া, অরক্ষিতকে রক্ষা করা, রোগীর সেবা করা, মোহাচ্ছন্নকে মোহমুক্ত করা সকলের নৈতিক কর্তব্য। তিনি আরও বললেন, এ জগতে মাতাপিতা, শ্রমণ-ব্রাহ্মণ, আর্তপীড়িত এবং গুরুজনের সেবায় সুখ লাভ করা যায়।

এখন আমরা যদি মৈত্রীকে ধারণ করে বুদ্ধের দেশিত কর্ম ও কর্মফলের শিক্ষায় যাই, তবে কী পাই? বুদ্ধের শিক্ষার বা দর্শনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এই কর্ম ও কর্মফল। এই কর্মের গুরুত্ব বুঝতে সময়কে আগে বুঝতে হবে। অর্থাৎ বুদ্ধ বর্তমান সময়কে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। অতীত ও ভবিষ্যৎ সময়ের চেয়ে বর্তমান সময়ের প্রতিটি মুহুর্তের কৃত কর্মকে তিনি দাম দিয়েছেন। বুদ্ধের দেশিত কর্ম ও কর্মফলে তাই বর্তমান সময়ের গুরুত্ব অত্যধিক। অতীতরে মাঝে বসবাস বা ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্নবিলাস দেখার পরিবর্তে বর্তমানে সুখে বেঁচে থাকার জন্য যথাযথ কর্ম সম্পাদন করার বিষয়ে উৎসাহ দিতেন। ঈশ্বর, দেবতাদের অনুগ্রহ, স্বর্গ, নরক, পরকাল, সকল ভবষ্যিতের অদেখা মৃত্যু পরবর্তী ভাবনা ইত্যাদি বস্তুত বর্তমান কর্মসংস্থান তৈরির ক্ষেত্রে অহেতুক বোঝা। সৎ কর্মের ফলাফলের ওপর স্বীয় নিয়ন্ত্রণ ও মুক্তি প্রতষ্ঠিতি হয়।

অতীত কখনও ফিরে আসে না, এই ভাবনায় সময় ব্যয় অর্থহীন। ভবিষ্যৎ বর্তমানের ওপর দাঁড়িয়ে। কাজইে ভূত-ভবষ্যিতের অনাগত নিয়ন্ত্রকের ভাবনা বর্তমানের প্রতি মুহুর্তকে নষ্টের সামলি। পূজা, আরাধনা, ভক্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে সুফলপ্রাপ্তির  আশাকে সময় অপচয় ও অর্থহীন বলেছেন। তথাগত বুদ্ধ বলেছেন, মনুষ্য জন্ম দুর্লভ। যার অন্তর্নিহিত সার বিষয় হচ্ছে এই জন্মের প্রতি সেকেণ্ড অতি গুরুত্বপূর্ণ ভেবে মানুষের বাস্তবকিই যথাযথভাবে সুকর্ম সম্পাদন করা উচতি। সম্যক কর্মের মাধ্যমইে সুফল অর্জন হয়, যা মানুষ ভোগ করে। এই যে কর্ম ও কর্মফলের পাঠ, তা-ই আজ কর্পোরেট বিশ্ব অনুসরণ করছে। উন্নত দেশগুলরি অর্থনীতি, সমৃদ্ধি ও উন্নতি দাঁড়িয়ে আছে প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে দেশিত বুদ্ধের কর্ম ও কর্মফলের সঙ্গে এই টাইমিং শিক্ষার বাস্তব প্রয়োগের মধ্যইে। তাই আমাদের ব্যক্তিগত, সমষ্ঠিগত, জাতিগত ও রাষ্ট্রীয় যে-কোনো লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সত্যিকারে সাহায্য করতে পারে বুদ্ধের কর্ম ও কর্মফল তত্ত্বকে সময়ের সমানুপাতে অনুধাবন ও বুঝা। বুদ্ধের দেশিত সকল সূত্রগুলোতে এ বিষয়ক দর্শন বা উপদেশ পাওয়া যায়। ধর্মগ্রন্থগুলো থেকে উপদেশবাণীগুলো আউরানো বা আবৃত্তি করার মাঝে তেমন কোনো ফল উৎপাদন হয় না। প্রকৃত সুফল পেতে হলে সেগুলো আচরণ ও ব্যবহারিক প্রয়োগ করতে হবে। উদাহরণস্বরূপ চীনের মাও সেতুং এবং দেং জিয়াও পিং-এর বুদ্ধের শিক্ষার প্রায়োগিক কর্ম ও কর্মফলের দৃষ্টান্ত দেয়া যায়।

এক সময় চীনে বুদ্ধের শিক্ষাকে আবৃত্তি নির্ভর তন্ত্রমন্ত্রে নিবন্ধিত করে দেবানুগ্রহ, পূজা ও শক্তি আরাধনায় মানুষের সমস্ত দুর্দশা মুক্তির পথ খুঁজতে যখন ব্যস্ত ছিল, তখন চীন পৃথিবীর অন্যতম ক্ষুধা, অশিক্ষা ও দারিদ্রের মধ্যে ছিল। অবস্থা এমন ছিল যে ক্ষুধার জ্বালায় এমন কিছু নেই যা খেত না, সর্বভুক এক জাতিতে পরিণত হয়ে উঠেছিল। গুরু নির্ভর তান্ত্রকি শক্তিধর আর্চাযরে হাতে ছিল সমাজব্যবস্থা। তাদের আরাধ্য নানা বিচিত্র শক্তিদেবতার পূজারী ও অনুসারীরা, অন্য গুরু ও তার শক্তিদেবতার পূজা নির্ভর অনুসারীরা পারস্পরকি বাদবিসংবাদে প্রায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও ঝগড়াঝাটিতেই ব্যস্ত ছিল। পরকাল, পাপ-পুণ্য সকল গুরু বা মাস্টারদের প্রবর্তিত নিয়মেই চলতো। বুদ্ধ সেখানে সকলের সামনে এক মূর্তির নাম, তার আশেপাশেই সকল শক্তদিবেতাদের অবস্থান।

এই অবস্থায় মাও সতেুং-এর কৃষক-শ্রমিক-জনতার বিপ্লবের পর টেম্পল নির্ভর গুরুদের সকল সামাজিক আচার ও শাসনকে চীনে সাময়িক নিষিদ্ধ ও স্থগতি করা হলো। কাজ শুরু হলো জনতাকে নিয়ে। গড়ে তোলা হলো সমবায় অর্থনীতি। পরর্বতীকালে দেং জিয়াও পিং চীনরে সকল টেম্পলে চালু করলেন ক্ষুদ্র শিল্প শিক্ষা কার্যক্রম। এটি এতই বেগবান করলেন যে প্রতি গ্রামে মহল্লায় ছোট ছোট কারিগরি, ভেষজ ও ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠিত করা হলো। বর্তমান আর কাজ, এ দুটোয় চীনকে বেঁধে ফেললেন। যার পরিনতি আজকের চীন জ্ঞানবিজ্ঞান, শিল্প, অর্থনীতি, ধর্ম সবখানেই লাভ করলো এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত। দ্য সিক্রেট বুক অব চাইনিজ ফিলোসোফি-তে দেং জিয়াও উল্লেখ করেন, বুদ্ধের বাস্তু কর্মবাদের শিক্ষাই তিনি চীনা জনগণকে দিয়েছেন। তিনি ধর্মহীনতাকে নয়, মানবিক মানুষের প্রকৃত বুদ্ধের ধর্মইে চীনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

ঠিক এই আলোকেই আজকের পার্বত্য পরিস্থিতির মূল্যায়ন করে বুদ্ধের কর্ম ও কর্মফল শিক্ষাকে পুনরায় ভাবার সময় এসেছে। শুধু উল্লেখিত দুটি বুদ্ধের শিক্ষা ব্যবহার করেই উন্নতি করা সম্ভব। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদবিাসী নৃ-গোষ্ঠীর শিশু কিশোর-বালক-বালিকাদের শিক্ষার প্রথম পাঠ শুরু হয়েছিল অতীতে সাধারণত বৌদ্ধ মন্দিরে। এটা তাদের কাছে কিয়ং বা কেয়াং নামে পরিচিত। তাই জনবসতিবহুল ও আর্থিকভাবে স্বচ্ছল প্রতিটি বৌদ্ধ অধ্যুষিত গ্রামে কিয়ং বা কেয়াং  থাকা মানেই সামাজকি সাংস্কৃতিক কর্মচাঞ্চল্যতা ও সমৃদ্ধতার পরিচয় বহন করা। বৌদ্ধ পুরোহিত, ভিক্ষু-শ্রমণ কর্তৃক পালিভাষায় প্রাচ্য শিক্ষা (Oriental education) ও বুদ্ধধর্মের নানা শাস্ত্রীয় শিষ্টাচার (Hymn) এই বৌদ্ধ মন্দরিগুলোতেই শেখানো হতো। প্রায় ক্ষেত্রে এই বৌদ্ধ মন্দিরগুলোতে অনেকটা আবাসকি স্কুলের মতো বৌদ্ধ মন্দির সংযুক্ত পালিটোল বা আশ্রম স্থাপতি হতো যা গ্রামের স্বচ্ছল ও স্বাবলম্বী বৌদ্ধ উপাসক-উপাসিকাদের দ্বারা আর্থিকভাবে সাহায্যপুষ্ট ও পরিচালিত।

অতীতে পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধ মন্দির মাত্রই ছিল এক একটি আবাসিক কেন্দ্র। ভিক্ষুদের নির্জনে আধ্যাত্মকি জ্ঞানর্চচার প্রয়োজনে প্রথমে সেগুলোর উৎপত্তি হয়েছিল। কিন্তু ক্রমশ তাদের রূপ বদলালো। পরবর্তিত হলো শিক্ষাকেন্দ্রে। যেখানে দূরদূরান্ত থেকে আসতো শিক্ষার্থীরা। এই শিক্ষাকেন্দ্র কিয়ং-এ প্রবেশের অর্থাৎ ভর্তি নিয়মেও ছিল না তেমন কঠোরতা। এখানে অন্যান্য ধর্মাবলম্বী বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীকে সযত্নে শিক্ষা দেয়া হতো। এসব কিয়ং-এ শিক্ষার্থীরা বিনা বেতনে শিক্ষা নিতো। এমনকি খাওয়া-দাওয়া থেকে শুরু করে বাসস্থান ও পোষাক-পরিচ্ছদ-বিছ্নাপত্র সব কিছুই ছিল বিনা খরচায়।

ধর্মপ্রবণতা, উদারতা ও সহনশীলতা পার্বত্যবাসীদের চরিত্রের এক একটি বিশেষ গুণ। সৎ কাজে শ্রম দেয়া, দান করা, সেবা-যত্ন করা এবং একে অপরকে সহযোগিতা করাএসব গুণের পরিচয় ভূরি ভূরি মেলে তৎকালীন পার্বত্য এলাকায়। তাই সুখী-সমৃদ্ধ হতে চাইলে কর্ম ও কর্মফলকে জেনে বুঝে জীবন চলার পথে যথাযথ কর্ম সম্পাদন করতে এবং মহৎ গুণাবলী অর্জন করতে সচেষ্ট হওয়া উচিত। বর্তমান সময়ের কৃত সুকর্মই বর্তমানে ও ভবিষ্যতে সমস্ত দুঃখ-দুর্দশা হতে মুক্তি দিবে, সুখী-সমৃদ্ধ করবে।

লেখক পরিচিতিঃ আন্তর্জাতিক খ্যাতিমান প্রকৌশলী এবং সভাপতি, বাংলাদেশ বাংগালী মূল নিবাসী ইউনয়িন।

শেয়ার:

ফেইসবুক একাউন্ট দিয়ে কমেন্ট করুন।

ফটোগ্রাপি

জনপ্রিয় পোষ্ট

অনুসরণ করুন

facebook

ক্যাটাগরি

    প্রবন্ধ

সাম্প্রতিক পোষ্ট

অন্যান্য সাইট

  • Suttacentral
  • Kalpataruboi
  • Dhammatext

Featured Post

একটু সহানুভূতি : শ্রীমৎ অভিজ্ঞানন্দ ভিক্ষু

হে প্রভু—— মানবতার আকাশে আজ আগের মতো হয় না সোনালী স্নিগ্ধ ভোর জটপাকে কেটে যায় সময়ের প্রতিটি শাশ্বত প্রহর এ কেমন ঘোর, কী নিদা...

Pages

Theme Support

Need our help to upload or customize this blogger template? Contact me with details about the theme customization you need.