ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে মহাপুণ্যবান মহামানব আর্যশ্রাবক শ্রীমৎ সাধনানন্দ মহাস্থবির (বনভন্তে)-এর শুভ আবির্ভাব হয়েছিল। বৌদ্ধ জাতির ভাগ্যাকাশে উদিত বনভন্তে নামক প্রজ্ঞা-রবির প্রভাবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের পার্বত্য জনপদ নব আলোয় আলোকিত হয়েছিল। নব প্রেরণায় ঘুরে দাঁড়াবার শক্তি-সাহস খুঁজে পেয়েছিল পাহাড়ের বৌদ্ধ গণমানুষ। না-হিন্দু, না-বৌদ্ধ ধরনের কিম্ভূতকিমাকার সামাজিক অবয়ব থেকে বেরিয়ে এসে নিজেদের বৌদ্ধ সত্তা-বোধের বিকাশে সম্বিৎ ফিরে পেয়েছিল।
বুদ্ধের শাসনকালের নির্ধারিত পাঁচ হাজার বছরের প্রায় অর্ধেকটা অতিক্রান্ত। অর্থাৎ এই শাসনকালের মধ্য থেকে প্রায় তিন হাজার বছর যায় যায় করছে। বিশ্বময় বৌদ্ধ জনতার জাগরণী কল্লোল এখনো থেমে নেই। ঊনবিংশ শতাব্দীর চৌকাঠ পেরিয়ে বিংশ শতাব্দীর সূচনা লগ্নে দাঁড়িয়ে আজও বুদ্ধের শাসন অভিবৃদ্ধিতে নতুন মাত্রা যোগের সুযোগ বিদ্যমান।
এই সেই বনভন্তে, যিনি এ দেশের বৌদ্ধ জাতির প্রাণে সুপ্তি ভাঙার গান শুনিয়েছিলেন। প্রচার সর্বস্ব হিন্দু ধর্ম ও খ্রিস্টধর্ম এবং নাস্তিক্য কম্যুনিজমের বিষবাষ্পে ধূমায়িত পার্বত্য জনপদে এক সময় নিভু নিভু হয়ে জ্বলেছিল সদ্ধর্মের ক্ষীণ দীপশিখা; শক্ত হাতে সদ্ধর্মের হাল ধরার কেউই ছিলেন না। পূজ্য বনভন্তের উদ্দেশ্য অপর সম্প্রদায়ের ভিক্ষুদের অনেকেই বলেছিলেন, চাকমাদের বুঝাও ... ইত্যাদি। অতিসত্য কথা যে প্রকৃত বৌদ্ধধর্ম, বৌদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার পরিবেশ সৃজনে বনভন্তের বৈপ্লবিক উত্থানের সামনে অবৌদ্ধোচিত মনগড়া সংস্কৃতির ধকল দাঁড়াতেই পারেনি। আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই শতসহস্র কোটি বার পূজ্য বনভন্তের প্রতি। তাঁর সূচিত ধর্মাভিযান যেন অব্যাহত থাকে। দেশনা চক্রের পথে যেন কোনো বাধা না আসে।
পূজ্য বনভন্তে চেয়েছিলেন—মাস্টার্স, ডক্টরেট, এম.বি.বি.এস, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রীধারীরা, উচ্চ শিক্ষিতরা প্রব্রজ্যাধর্ম গ্রহণ করে তাঁদের মেধা-মননকে বৌদ্ধ সমাজের প্রগতির কাজে নিয়োজিত করুক। ম্রিয়মান ক্ষয়িষ্ণু বৌদ্ধ সমাজকে এগিয়ে নিতে দক্ষ, যোগ্য, উচ্চ শিক্ষিত পারদর্শী সংঘশক্তির বিকল্প নেই। বৌদ্ধ প্রতিরূপ দেশগুলোতে সুযোগ্য সুদক্ষ ভিক্ষুসংঘ সেই দেশগুলোর অনুকূল পরিবেশে সগৌরবে সদ্ধর্মের স্থিতি বিধানে নিয়োজিত। আমরা অপ্রতিরূপ দেশের দুর্ভাগা বৌদ্ধ জাতি সর্বদাই বিভিন্ন সংঘাত, অমৈত্রী ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবেলা করছি। সর্বক্ষণ দুলছি অস্তিত্ব সংকটের দোলাচলে। আমরা জানি, পূজ্য বনভন্তেধনপাতা, দীঘিনালা ও তিনটিলার গভীর বনে অবস্থান করেছিলেন। বর্ষাবাস যাপন করেছিলেন আরও কিছু বিহারে, খাগড়াছড়ির ধর্মপুর আর্য বন বিহারে। যেই বিহারে তিনি অবস্থান করেছিলেন, সেই বিহারই হয়ে উঠেছে শাখা বন বিহার। পাহাড়ের আনাচে-কানাচে রাজবন বিহারের শাখা বন বিহারগুলোতে ছড়িয়ে রয়েছেন বনভন্তের সুযোগ্য শিষ্য-প্রশিষ্যবর্গ—যাঁদের কর্মযোগের সবকিছুই বুদ্ধশাসনের হিতৈষণায় নিবেদিত।
বনভন্তের ভিক্ষুসংঘের মধ্য থেকে প্রায় প্রতিবছর ‘স্থবির’ ও ‘মহাস্থবির’ পদে উন্নীত হন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাংঘিক ব্যক্তিত্ব। যাদের ভেতরে রয়েছেন অনেক উচ্চ শিক্ষিত, অল্প শিক্ষিত, মধ্যম শিক্ষিত ভিক্ষু-শ্রমণ। এদের মধ্যে বয়সে কেউ কনিষ্ঠ, কেউ জ্যেষ্ঠ, কেউ প্রবীণ, কেউ নবীন। বয়স ও শিক্ষার মাপকাঠি দিয়ে এসব স্থবির-মহাস্থবিরদের উচ্চতার পরিমাপ করা সম্ভব নয়, বরং তাঁদের পূর্ব জন্মার্জিত পুণ্য পারমী, কুশল সংস্কার এবং পারমার্থিক জ্ঞানের পরিধিই প্রধান বিবেচ্য। যাঁরা বনভন্তের যোগ্য উত্তরসূরি—বনভন্তের ভাবাদর্শ, কর্মযোগ, দর্শন বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ দেশনা প্রদানে সক্ষম এবং সুচারুভাবে সত্যপথে চলতে সক্ষম তাঁরাই বৌদ্ধ সমাজের অগ্রগতির রথকে সচল রাখতে সক্ষম হবেন। এটাই স্বাভাবিক যে, ভবিষ্যতে যদি ধর্মীয় জ্ঞান লাভে উদ্যমী এবং উচ্চ ডিগ্রিধারীরা প্রব্রজিত হতে থাকেন, তাহলে বনভন্তের স্বপ্নগাথা পরিপূরণের পথ প্রশস্ত হবে। আমাদের কাঙ্ক্ষিত আদর্শ বৌদ্ধ সমাজ, আদর্শ বৌদ্ধপল্লী বিনির্মাণ সহজতর হবে।
আজকের বাংলাদেশের ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং ভারতের মিজোরাম, ত্রিপুরা ও অরুণাচলে প্রতিষ্ঠিত রাজবন বিহারের শাখাগুলোসহ পার্বত্যাঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শাখা বন বিহারগুলোর সংশ্লিষ্ট সকল উপাসক-উপাসিকাদের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের মাধ্যমে ‘বনভন্তের সূচিত আদর্শ বৌদ্ধপল্লীর রূপরেখা’ শীর্ষক আলোচনার বিশেষ প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি।
‘সব্বে সত্তা সুখিতা হোন্তু।’
লেখক পরিচিতি: শ্রীমৎ জিনবোধি মহাথের, অধ্যক্ষ, বোধিপুর বন বিহার, রাঙামাটি; প্রতিষ্ঠাতা, ত্রিশরণ ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ এবং ত্রৈমাসিক বোধিধারা (এটি ২০১৯ সালে “অনাবরণ” স্মরণিকায় প্রকাশিত হয়েছে)।






