তরুণ ভিক্ষুদের সম্বন্ধে আমারও কম সন্দেহ ছিল না যখন গৃহী ছিলাম আর ত্রিপিটক শিক্ষার ঝুলিটা একদম খালি ছিল। সন্দেহের ধরণটা এমন ছিল যে, লোকে যখন অতিরিক্ত সন্দেহের চোখে কাউকে তাকায় তখন তার চোখের পাতা মিনমিন করতে থাকে। মানে আদৌ তাকালো কি তাকালো না এমনভাবে ঘনঘন তির্যক দৃষ্টিতে দেখতে থাকে। আমার অবস্থাটাও ঠিক এরকম ছিল। তবে এখন শিক্ষার ঝুলিটাতে বুদ্ধের মূল্যবান উপদেশে ভরিয়ে নিচ্ছি তাই সন্দেটা দূর হয়েছে সেটা অন্তত বলতে পারি।
ব্যাপারটা বুদ্ধের শিক্ষার নিড়িকে বিচার না করলে আসলে এরকম প্রশ্নের জন্ম দেয়া বা সন্দেহ করাটাই স্বাভাবিক। অন্য ধর্মাবলম্বীদের তো সত্যি সত্যি এটি প্রশ্নের বিষয়। কেননা এই ঝলমলে রঙিন দুনিয়ায় কতো কিছুই না পার্থিব ভোগের বিষয়, যা সারা জীবন উপভোগ করলেও ফুরাই না। এখন তো আরো আধুনিক যুগ, আরো উন্নত। তাই এ যুগে তরুণ সন্ন্যাসীরা আসলে কী করেন? জীবন কাটিয়ে দেন বা তাঁরা কী করে? তাঁদের কি কোনো ইচ্ছা জাগে না? বিপরীত লিঙ্গের (নারীর) প্রতি তাঁদের কি কোনো টান নেই? একটু সাহিত্যের ভাষায় বলতে গেলে তাঁদের সৃষ্টির শাশ্বত প্রেম কি মৃত অথবা মরে যায়? না কি তাঁদের মন রোবটের মতো যা ইন্দ্রিয়ের অনুভূতি কিছুই বোঝে না? আসলে তাঁরা সুদীর্ঘ একটা রসকষহীন (কেন রসকষহীন বললাম তা নিচে টের পাওয়া যাবে) জীবন কাটিয়ে দেন-বা কীভাবে?
সংসার করে বুড়ো বয়সে না হয় একটা কথা। তখন অন্তত বাসি হয়ে যাওয়া ভোগ্যবস্তুতে চাহিদা হ্রাস পেয়ে যেত (আসলে কি তাই?)। কিন্তু তরুণ ভিক্ষুরা তো এখনো উদ্দীপ্ত, প্রস্ফুটিত ফুলের মতো যৌবন। এখনো চৌকাট ডিঙিয়ে যাওয়া অস্থির প্রান্তে বাঁধভাঙা উদ্দাম আবেগ। মনে অজস্র স্বপ্নের সম্ভার বুকে চাপা দিয়ে কেবল একটি বৃত্তের মধ্যে ডুবে থাকা কিভাবে সম্ভব!! যে বয়সে প্রতিটি তরুণ মুক্ত বিহঙ্গের মতো উন্মুক্ত ঘন মেঘের নীলিমা ছুঁয়ে যেতে চায়, সে বয়সে কিনা তাঁরা গৈরিক বসন পরিধান করে মা-বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন এমনকি জীবন-যৌবন সবকিছু ত্যাগ করে এ অবস্থা?
একবার রাজবন বিহারে থাকাকালীন কোন একটা ইউনিভার্সিটির (নামটা মনে নেই) একদল বাঙালী তরুণ-তরুণী রাজবন বিহার দর্শন করতে এসেছিলেন। একঁফাকে তাদের সাথে আমার তাদের ধর্মমত সম্পর্কে কথা হয়। এক পর্যায়ে তাঁরা (ছেলেরা) আমাকে বললেন, “ভন্তে, আপনারা খুবই নিষ্টুর। আর আপনাদের জীবনও একদম রসকষহীন।” আমি বললাম এরকম মনে হলো কেন? তাঁরা বললেন, “এই যে আপনারা বিয়ে না করে মেয়েদেরকে কষ্ট দিচ্ছেন। আমাদের ধর্মে আল্লাহ পাক তো প্রত্যেকের জন্য একটি করে নারী সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে কষ্ট দেয়া কি ঠিক?” পাশে থাকা মেয়েরা লজ্জাবতী লতার মতো মুচকি হাসিতে একটু একটু মিইয়ে পড়ছিলেন তখন। আমি বললাম, “দেখুন, বিষয়টা আপাতদৃষ্টিতে এমন মনে হলেও আসলে ঠিক সেরকম না। কষ্ট দেয়া বা নিষ্টুর হওয়ার বিষয় এটা নয়। কেননা কষ্ট দেয়া বা নিষ্টুরতা তখনই বোঝায় যখন কেউ কাউকে শারিরীক বা মানসিকভাবে আঘাত করে। আপনারা যদি আমাদের এই ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের আরো গভীরে প্রবেশ করেন তাহলে মেয়েদেরকে কষ্ট দেয়ার বিষয় কখনো খুঁজে পাবেন না।”
আগে তো চাকমা সমাজে এ বিষয়টা ছিল একদম রাতের অন্ধকারের মতো আচ্ছন্ন। তখন বলা হতো প্রব্রজ্যা নেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে বুড়ো বয়স। এ বয়সটার মতো উপযুক্ত বয়স নাকি দ্বিতীয় আরেকটা হয় না। এমনকি প্রবজ্যা হতোও একদম জীবনের শেষ বয়সে। অর্থাৎ বিয়েসাদী করে ছেলেপুলে লাভ করে, এরপর তাদেরকে বিয়েসাদী করিয়ে বোনাস হিসেবে নাতি-নাতনি পেয়ে তারপরই প্রবজ্যার কথা ভেবে বসত। সেটাও আবার হলে হলো না হলে নাই।
তবে বর্তমানে বনভন্তের কল্যাণে সেই ধারণাটা অনেকটা লোপ পেয়েছে বলা যায়। কেননা তিনিই তো বীরের মতন দেখিয়ে দিয়েছেন তরুণ বয়সেও প্রবজ্যা নিয়ে সফলতা লাভ করা যায়, সার্থক একটা জীবন গঠন করা যায়। তিনি সেটা পেরেছেন বলে, দেখিয়েছেন বলে অনেকে তরুণ বয়সে ভরা যৌবনে প্রবজ্যা নিয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন, এখনো করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। আগের তুলনায় বর্তমানে ধর্মের স্রোতধারা অনেকটা বেগবান হলেও ধারণাটা পুরোপুরি উধাও হয়েছে বলা যাবে না। কেননা তরুণ ভিক্ষুদেরকে এখনো এমন একটা সন্দেহের চোখে তাকানো হয় যে, “এই ভিক্ষু এই মুহুর্ত্বে লম্বা লম্বা লেকচার দিলেও না জানি কবে চেরেত্তং করে (রংকাপড় ছেড়ে চলে যাওয়া)।
তরুণ ভিক্ষুদের সম্পর্কে এমন ধারণা তৈরী হওয়ার পেছনে প্রথমত আমি মনে করি আজন্ম পারিপার্শ্বিক পরিবেশ। যে পরিবেশে আমরা বেড়ে উঠি তাতে এমন ধারণা মুড়িমুড়কির মতো ছড়ানো। ফলে ধারণাটি স্বাভাবিক একটা নিয়মে পরিণত হয়ে যায়। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক আধুনিকযুগে ব্যক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলতে তো একটা কথা আছে। যাইহোক, তরুণ ভিক্ষুদেরকে নিয়ে যে-ই মতবাদ প্রচলিত থাক না কেন এখন আমরা নজর দেব বুদ্ধের সময়কালের একটি কথোপকথনের দিকে। সেই কথোপকথনটাও এমনি একটি সন্দেহপ্রবণ বিষয় যেটা তরুণ ভিক্ষুদেরকে নিয়ে করা হয়েছিল। এটি হচ্ছে সংযুক্ত নিকায়ের একটি সূত্রে। সেখানে রাজা উদেন ও পিণ্ডোল-ভারদ্বাজ ভন্তের মধ্যে অসম্ভব সুন্দর একটি কথোপকথন। আশাকরি আগ্রহী পাঠক তরুণ ভিক্ষুদের প্রতি আপনার জমে থাকা সন্দেহের অর্থহীন বিষয়টি আমার মতো দূর হয়ে যাবে। চলুন তাহলে সেই কাঙ্ক্ষিত বিষয়টাকে তুলে ধরা যাক:
কৌশাম্বির রাজা উদেন একসময় পিণ্ডোল-ভারদ্বাজ ভন্তেকে এভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ভন্তে ভারদ্বাজ, কীভাবে এটি সম্ভব যে, এই তরুণ ভিক্ষুরা, যারা এখনো উদ্দীপ্ত ও দুরন্তপনা যুবক, তাদের চুল এখনো ঘনকালো, প্রস্ফুটিত ফুলের মতো যৌবন। তারা জীবনের তুঙ্গ সময়ে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ না করেই ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত?”
“মহারাজ, আমাদের ভগবান, যিনি অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, তিনি জানেন ও দেখেন। তাই তিনি বলেছেন, ‘ভিক্ষুগণ, এসো। যে নারীটি হচ্ছে মায়ের সমতুল্য, তাকে মা হিসেবেই ভাবো। যে নারীটি বোনের সমতুল্য, তাকে কেবল বোন হিসেবে ভাবো। যে নারীটি কন্যার সমতুল্য, তাকে কেবল কন্যা হিসেবে ভাবো।’ এভাবেই এই তরুণ ভিক্ষুরা, যারা এখনো উদ্দীপ্ত ও দুরন্তপনা যুবক, যাদের চুল এখনো ঘনকালো, প্রস্ফুটিত ফুলের মতো যৌবন, তারা জীবনের তুঙ্গ সময়ে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ না করেই ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত।”
“কিন্তু ভন্তে, মন তো খুবই চঞ্চল। মাঝে মাঝে এমনও তো হতে পারে, যখন তারা যাদেরকে কেবল মা হিসেবে, কেবল বোন হিসেবে অথবা কেবল কন্যা হিসেবে ভাবে, তাদেরকে নিয়েও তো কামসুখের চিন্তা জাগতে পারে। এছাড়া অন্য কোনো কারণ কি আছে, যার দ্বারা এই তরুণ ভিক্ষুরা… তারা ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত?”
“মহারাজ, ভগবান বলেছেন, ‘ভিক্ষুগণ, এসো। এই দেহকে অনুধাবন করো। পায়ের তলার উপর থেকে মাথার চূড়ার নিচ পর্যন্ত দেখ, যা চামড়া দিয়ে আবৃত, বহু ধরনের অশুচি জিনিস দিয়ে পরিপূর্ণ। এই দেহে আছে চুল, লোম, নখ, দাঁত, চামড়া, মাংস, পেশীতন্তু, হাড়, হাড়ের মজ্জা, কিডনি, হৃদপিণ্ড, যকৃৎ, ঝিল্লি, প্লীহা, ফুসফুস, অন্ত্র, অন্ত্রগুণ, পাকস্থলী, মল, পিত্ত, শ্লেষ্মা, পুঁজ, রক্ত, ঘাম, চর্বি, অশ্রু, তেল, লালা, লসিকা, প্রস্রাব।’ এভাবেই অনুধাবন করে এই তরুণ ভিক্ষুরা... তারা ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত।”
“ঠিক আছে ভন্তে। যেসব ভিক্ষু দেহ, শীল, মন ও বিদর্শন শিক্ষা করে, তাদের জন্য সেটি না হয় সহজ হলো। কিন্তু যারা সেগুলো করে না, তাদের জন্য তা কঠিনই তো বটে। মাঝে মাঝে কোনো লোক ভাবে, “আমি এটিকে ঘৃণিত বস্তু হিসেবে দেখব।” কিন্তু হয় কী, সে সেটিকে আকর্ষণীয় হিসেবে উল্টোটাই দেখে। আরো অন্য কোনো কারণ কি আছে যার দ্বারা এই তরুণ ভিক্ষুরা... তারা ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত?”
“মহারাজ, ভগবান বলেছেন, “ভিক্ষুগণ, এসো। তোমাদের ইন্দ্রিয়দ্বারগুলোকে সুরক্ষিত রাখ। চোখ দিয়ে কোনো জিনিস দেখে সেটার সার্বিক চেহারাকে আঁকড়ে ধরে থেকো না। খুঁটিনাটি বিষয়কেও আঁকড়ে ধরে থেকো না। কারণ, চোখ ইন্দ্রিয়কে অসংযত করে বাস করলে লোভ, শোক এবং অন্যান্য খারাপ অকুশল বিষয়গুলো তার দিকে প্রবাহিত হয়। তাই এর সংযমের জন্য সচেষ্ট হও, এটিকে সুরক্ষিত রাখ এবং সংযম রক্ষা কর। শব্দ শুনে, গন্ধ পেয়ে, স্বাদ পেয়ে, স্পর্শ পেয়ে, মানসিক বিষয়কে অনুভব করে সেটার সার্বিক চেহারাকে আঁকড়ে ধরে থেকো না, খুঁটিনাটি বিষয়কেও আঁকড়ে ধরে থেকো না। কারণ কানইন্দ্রিয়কে, নাকইন্দ্রিয়কে, জিহ্বাইন্দ্রিয়কে, কায়ইন্দ্রিয়কে, মনইন্দ্রিয়কে অসংযত করে বাস করলে লোভ, শোক এবং অন্যান্য খারাপ অকুশল বিষয়গুলো তার দিকে প্রবাহিত হয়। তাই এর সংযমের জন্য সচেষ্ট হও, এটিকে সুরক্ষিত রাখ এবং সংযম রক্ষা কর।’ এভাবেই এই তরুণ ভিক্ষুরা, যারা এখনো উদ্দীপ্ত ও দুরন্তপনা যুবক, যাদের চুল এখনো ঘনকালো, প্রস্ফুটিত ফুলের মতো যৌবন, তারা জীবনের তুঙ্গ সময়ে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ না করেই ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত।” স.নি ১৬.১২৭
সংসার করে বুড়ো বয়সে না হয় একটা কথা। তখন অন্তত বাসি হয়ে যাওয়া ভোগ্যবস্তুতে চাহিদা হ্রাস পেয়ে যেত (আসলে কি তাই?)। কিন্তু তরুণ ভিক্ষুরা তো এখনো উদ্দীপ্ত, প্রস্ফুটিত ফুলের মতো যৌবন। এখনো চৌকাট ডিঙিয়ে যাওয়া অস্থির প্রান্তে বাঁধভাঙা উদ্দাম আবেগ। মনে অজস্র স্বপ্নের সম্ভার বুকে চাপা দিয়ে কেবল একটি বৃত্তের মধ্যে ডুবে থাকা কিভাবে সম্ভব!! যে বয়সে প্রতিটি তরুণ মুক্ত বিহঙ্গের মতো উন্মুক্ত ঘন মেঘের নীলিমা ছুঁয়ে যেতে চায়, সে বয়সে কিনা তাঁরা গৈরিক বসন পরিধান করে মা-বাবা, ভাই-বোন, বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন এমনকি জীবন-যৌবন সবকিছু ত্যাগ করে এ অবস্থা?
একবার রাজবন বিহারে থাকাকালীন কোন একটা ইউনিভার্সিটির (নামটা মনে নেই) একদল বাঙালী তরুণ-তরুণী রাজবন বিহার দর্শন করতে এসেছিলেন। একঁফাকে তাদের সাথে আমার তাদের ধর্মমত সম্পর্কে কথা হয়। এক পর্যায়ে তাঁরা (ছেলেরা) আমাকে বললেন, “ভন্তে, আপনারা খুবই নিষ্টুর। আর আপনাদের জীবনও একদম রসকষহীন।” আমি বললাম এরকম মনে হলো কেন? তাঁরা বললেন, “এই যে আপনারা বিয়ে না করে মেয়েদেরকে কষ্ট দিচ্ছেন। আমাদের ধর্মে আল্লাহ পাক তো প্রত্যেকের জন্য একটি করে নারী সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে কষ্ট দেয়া কি ঠিক?” পাশে থাকা মেয়েরা লজ্জাবতী লতার মতো মুচকি হাসিতে একটু একটু মিইয়ে পড়ছিলেন তখন। আমি বললাম, “দেখুন, বিষয়টা আপাতদৃষ্টিতে এমন মনে হলেও আসলে ঠিক সেরকম না। কষ্ট দেয়া বা নিষ্টুর হওয়ার বিষয় এটা নয়। কেননা কষ্ট দেয়া বা নিষ্টুরতা তখনই বোঝায় যখন কেউ কাউকে শারিরীক বা মানসিকভাবে আঘাত করে। আপনারা যদি আমাদের এই ধর্মীয় বৈশিষ্ট্যের আরো গভীরে প্রবেশ করেন তাহলে মেয়েদেরকে কষ্ট দেয়ার বিষয় কখনো খুঁজে পাবেন না।”
আগে তো চাকমা সমাজে এ বিষয়টা ছিল একদম রাতের অন্ধকারের মতো আচ্ছন্ন। তখন বলা হতো প্রব্রজ্যা নেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত সময় হচ্ছে বুড়ো বয়স। এ বয়সটার মতো উপযুক্ত বয়স নাকি দ্বিতীয় আরেকটা হয় না। এমনকি প্রবজ্যা হতোও একদম জীবনের শেষ বয়সে। অর্থাৎ বিয়েসাদী করে ছেলেপুলে লাভ করে, এরপর তাদেরকে বিয়েসাদী করিয়ে বোনাস হিসেবে নাতি-নাতনি পেয়ে তারপরই প্রবজ্যার কথা ভেবে বসত। সেটাও আবার হলে হলো না হলে নাই।
তবে বর্তমানে বনভন্তের কল্যাণে সেই ধারণাটা অনেকটা লোপ পেয়েছে বলা যায়। কেননা তিনিই তো বীরের মতন দেখিয়ে দিয়েছেন তরুণ বয়সেও প্রবজ্যা নিয়ে সফলতা লাভ করা যায়, সার্থক একটা জীবন গঠন করা যায়। তিনি সেটা পেরেছেন বলে, দেখিয়েছেন বলে অনেকে তরুণ বয়সে ভরা যৌবনে প্রবজ্যা নিয়ে তাঁর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন, এখনো করছেন এবং ভবিষ্যতেও করবেন। আগের তুলনায় বর্তমানে ধর্মের স্রোতধারা অনেকটা বেগবান হলেও ধারণাটা পুরোপুরি উধাও হয়েছে বলা যাবে না। কেননা তরুণ ভিক্ষুদেরকে এখনো এমন একটা সন্দেহের চোখে তাকানো হয় যে, “এই ভিক্ষু এই মুহুর্ত্বে লম্বা লম্বা লেকচার দিলেও না জানি কবে চেরেত্তং করে (রংকাপড় ছেড়ে চলে যাওয়া)।
তরুণ ভিক্ষুদের সম্পর্কে এমন ধারণা তৈরী হওয়ার পেছনে প্রথমত আমি মনে করি আজন্ম পারিপার্শ্বিক পরিবেশ। যে পরিবেশে আমরা বেড়ে উঠি তাতে এমন ধারণা মুড়িমুড়কির মতো ছড়ানো। ফলে ধারণাটি স্বাভাবিক একটা নিয়মে পরিণত হয়ে যায়। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক আধুনিকযুগে ব্যক্তিগত মত প্রকাশের স্বাধীনতা বলতে তো একটা কথা আছে। যাইহোক, তরুণ ভিক্ষুদেরকে নিয়ে যে-ই মতবাদ প্রচলিত থাক না কেন এখন আমরা নজর দেব বুদ্ধের সময়কালের একটি কথোপকথনের দিকে। সেই কথোপকথনটাও এমনি একটি সন্দেহপ্রবণ বিষয় যেটা তরুণ ভিক্ষুদেরকে নিয়ে করা হয়েছিল। এটি হচ্ছে সংযুক্ত নিকায়ের একটি সূত্রে। সেখানে রাজা উদেন ও পিণ্ডোল-ভারদ্বাজ ভন্তের মধ্যে অসম্ভব সুন্দর একটি কথোপকথন। আশাকরি আগ্রহী পাঠক তরুণ ভিক্ষুদের প্রতি আপনার জমে থাকা সন্দেহের অর্থহীন বিষয়টি আমার মতো দূর হয়ে যাবে। চলুন তাহলে সেই কাঙ্ক্ষিত বিষয়টাকে তুলে ধরা যাক:
কৌশাম্বির রাজা উদেন একসময় পিণ্ডোল-ভারদ্বাজ ভন্তেকে এভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ভন্তে ভারদ্বাজ, কীভাবে এটি সম্ভব যে, এই তরুণ ভিক্ষুরা, যারা এখনো উদ্দীপ্ত ও দুরন্তপনা যুবক, তাদের চুল এখনো ঘনকালো, প্রস্ফুটিত ফুলের মতো যৌবন। তারা জীবনের তুঙ্গ সময়ে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ না করেই ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত?”
“মহারাজ, আমাদের ভগবান, যিনি অর্হৎ, সম্যকসম্বুদ্ধ, তিনি জানেন ও দেখেন। তাই তিনি বলেছেন, ‘ভিক্ষুগণ, এসো। যে নারীটি হচ্ছে মায়ের সমতুল্য, তাকে মা হিসেবেই ভাবো। যে নারীটি বোনের সমতুল্য, তাকে কেবল বোন হিসেবে ভাবো। যে নারীটি কন্যার সমতুল্য, তাকে কেবল কন্যা হিসেবে ভাবো।’ এভাবেই এই তরুণ ভিক্ষুরা, যারা এখনো উদ্দীপ্ত ও দুরন্তপনা যুবক, যাদের চুল এখনো ঘনকালো, প্রস্ফুটিত ফুলের মতো যৌবন, তারা জীবনের তুঙ্গ সময়ে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ না করেই ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত।”
“কিন্তু ভন্তে, মন তো খুবই চঞ্চল। মাঝে মাঝে এমনও তো হতে পারে, যখন তারা যাদেরকে কেবল মা হিসেবে, কেবল বোন হিসেবে অথবা কেবল কন্যা হিসেবে ভাবে, তাদেরকে নিয়েও তো কামসুখের চিন্তা জাগতে পারে। এছাড়া অন্য কোনো কারণ কি আছে, যার দ্বারা এই তরুণ ভিক্ষুরা… তারা ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত?”
“মহারাজ, ভগবান বলেছেন, ‘ভিক্ষুগণ, এসো। এই দেহকে অনুধাবন করো। পায়ের তলার উপর থেকে মাথার চূড়ার নিচ পর্যন্ত দেখ, যা চামড়া দিয়ে আবৃত, বহু ধরনের অশুচি জিনিস দিয়ে পরিপূর্ণ। এই দেহে আছে চুল, লোম, নখ, দাঁত, চামড়া, মাংস, পেশীতন্তু, হাড়, হাড়ের মজ্জা, কিডনি, হৃদপিণ্ড, যকৃৎ, ঝিল্লি, প্লীহা, ফুসফুস, অন্ত্র, অন্ত্রগুণ, পাকস্থলী, মল, পিত্ত, শ্লেষ্মা, পুঁজ, রক্ত, ঘাম, চর্বি, অশ্রু, তেল, লালা, লসিকা, প্রস্রাব।’ এভাবেই অনুধাবন করে এই তরুণ ভিক্ষুরা... তারা ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত।”
“ঠিক আছে ভন্তে। যেসব ভিক্ষু দেহ, শীল, মন ও বিদর্শন শিক্ষা করে, তাদের জন্য সেটি না হয় সহজ হলো। কিন্তু যারা সেগুলো করে না, তাদের জন্য তা কঠিনই তো বটে। মাঝে মাঝে কোনো লোক ভাবে, “আমি এটিকে ঘৃণিত বস্তু হিসেবে দেখব।” কিন্তু হয় কী, সে সেটিকে আকর্ষণীয় হিসেবে উল্টোটাই দেখে। আরো অন্য কোনো কারণ কি আছে যার দ্বারা এই তরুণ ভিক্ষুরা... তারা ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত?”
“মহারাজ, ভগবান বলেছেন, “ভিক্ষুগণ, এসো। তোমাদের ইন্দ্রিয়দ্বারগুলোকে সুরক্ষিত রাখ। চোখ দিয়ে কোনো জিনিস দেখে সেটার সার্বিক চেহারাকে আঁকড়ে ধরে থেকো না। খুঁটিনাটি বিষয়কেও আঁকড়ে ধরে থেকো না। কারণ, চোখ ইন্দ্রিয়কে অসংযত করে বাস করলে লোভ, শোক এবং অন্যান্য খারাপ অকুশল বিষয়গুলো তার দিকে প্রবাহিত হয়। তাই এর সংযমের জন্য সচেষ্ট হও, এটিকে সুরক্ষিত রাখ এবং সংযম রক্ষা কর। শব্দ শুনে, গন্ধ পেয়ে, স্বাদ পেয়ে, স্পর্শ পেয়ে, মানসিক বিষয়কে অনুভব করে সেটার সার্বিক চেহারাকে আঁকড়ে ধরে থেকো না, খুঁটিনাটি বিষয়কেও আঁকড়ে ধরে থেকো না। কারণ কানইন্দ্রিয়কে, নাকইন্দ্রিয়কে, জিহ্বাইন্দ্রিয়কে, কায়ইন্দ্রিয়কে, মনইন্দ্রিয়কে অসংযত করে বাস করলে লোভ, শোক এবং অন্যান্য খারাপ অকুশল বিষয়গুলো তার দিকে প্রবাহিত হয়। তাই এর সংযমের জন্য সচেষ্ট হও, এটিকে সুরক্ষিত রাখ এবং সংযম রক্ষা কর।’ এভাবেই এই তরুণ ভিক্ষুরা, যারা এখনো উদ্দীপ্ত ও দুরন্তপনা যুবক, যাদের চুল এখনো ঘনকালো, প্রস্ফুটিত ফুলের মতো যৌবন, তারা জীবনের তুঙ্গ সময়ে ইন্দ্রিয়সুখ ভোগ না করেই ব্রহ্মচর্য জীবন পরিপূর্ণভাবে এবং যথাযথভাবে অনুশীলন করতে পারে একদম জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত।” স.নি ১৬.১২৭







