বৌদ্ধধর্ম: সৌহার্দ্য ও জীবনবোধ : ড. জ্ঞানরত্ন মহাথেরো



শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার অনুশীলনে জীবনের পূর্ণতা, দুঃখমুক্তি এবং সর্ব দুঃখের অন্তসাধন নির্বাণ উপলব্ধির প্রত্যয়ে ব্যক্তি চরিত্র, সামজিক শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা বৌদ্ধ ধর্মের প্রধানতম লক্ষ্য রাষ্ট্র এবং সমাজ। মানুষ নির্ভর তাই মানবতাবাদী। সমাজ বিনির্মানে চাই বুদ্ধের অহিংসা, সাম্য এবং মৈত্রীর অবলম্বন ও অনুশীলন বুদ্ধের শিক্ষা মানব জীবনের দুঃখমুক্তি, সমাজকল্যাণ এবং রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধির নানা নির্দেশনায় পরিপূর্ণ বুদ্ধের দৃষ্টিতে মানুষ হল দেহ ও মন সমন্বয় আর মনের বিক্ষিপ্ত গতি প্রকৃতিই মানুষের সমস্ত দুঃখের কারণ মানুষ মাত্রই এই বলয়ের আবর্তে  বুদ্ধ এই বৃত্ত ভাঙ্গার দৃপ্ত প্রত্যয়ে প্রচার করলেন তাঁর অনুপম শিক্ষা যেখানে মানুষই প্রধানতম উপজীব্য, নেই কোন জাত-পাত, উচু-নিচু, ধনী-গরীব, গোত্র-বর্ণের সংকীর্ণ সীমাবদ্ধতা নেই দেশ কাল সীমানা আর অন্ধ বিশ্বাসের আতিশয্য, আছে প্রত্যক্ষ ফলাফলের যথাযথ নির্দেশনা, যার অনুশীলেন সফল হয় দুঃখ মুক্তির প্রচেষ্টা এবং সুন্দর ও সার্থক হয়ে উঠে জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রের মঙ্গলময় প্রত্যাশা

বুদ্ধের দর্শনে মানবতার সংস্কৃতি হল আত্মজ্ঞানে বিশ্ব মৈত্রীর পরিচর্যা, বুদ্ধের অনুশাসন হল সর্বপ্রকার পাপ হতে বিরতি, কুশল কর্মের পরিপুর্ণতা এবং স্বীয় চিত্তের পবিত্রতা সাধন এ লক্ষ্য অর্জনে বুদ্ধের শিক্ষা প্রথমত; চরিত্র গঠন এবং সামাজিক শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় হত্যা, চুরি, ব্যভিচার, মিথ্যাচার এবং মাদক সেবনে বিরতির শিক্ষা তারপর দুঃখের অবসান, সত্যের সন্ধান এবং মুক্তির পথ অন্বেষণে আর্য্য অষ্টাঙ্গিক মার্গের অনুশীলন যেমন সম্যক দৃষ্টি, সম্যক সংকল্প, সম্যক বাক্য, সম্যক কর্ম, সম্যক জীবিকা,  সম্যক প্রচেষ্টা, সম্যক স্মৃতি, সম্যক সমাধি  এই আটটি শিক্ষার যথাযথ অনুসরণ ও অনুশীলই শীল, সমাধি ও প্রজ্ঞার চর্চা, যা মানুষকে নিয়ে যায় প্রকৃত মনুষ্যত্বের বিকশিত শুদ্ধাচারে, জীবনবোধে পরিপূর্ণ মানুষের স্তরে যিনি কুশল অকুশলের পার্থক্য বুঝে পুণ্যপথের জীবন চর্চায় তাঁর কায়ে সংযত, বাক্যে সংযত, মনে সংযত যার নিজের শুদ্ধতায় আলোকিত হয় সমাজ, রাষ্ট্র আর মানুষের পারিপার্শ্বিকতা

মানুষই নির্ধারক সমাজ ও রাষ্ট্র চরিত্রের। তাই সমৃদ্ধশালী দেশ ও উন্নত সমাজ গঠনে জনগনের প্রতি বুদ্ধের উপদেশ হলো-
প্রথমতঃ সবসময় সম্মিলিতভাবে রাজনৈতিক বিষয়ে আলোচনা এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা গ্রহণ
দ্বিতীয়তঃ জাতীয় কোন বিষয়ে আলোচনার জন্য সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের ঐক্যবদ্ধ হওয়া
তৃতীয়তঃ পুরনো রাজনীতির প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শন, অপ্রাসঙ্গিকভাবে তা না বদলানো এবং প্রতিষ্ঠিত আনুষ্ঠানিক নীতি নিয়ম ও ন্যায় বিচার রক্ষা করা
চতুর্থতঃ নারী ও বয়োজ্যষ্ঠদের সন্মান প্রদর্শন এবং সামাজিক ও পারিবারিক পবিত্রতা রক্ষা করা পঞ্চমতঃ পিতা মাতার প্রতি সদয় এবং শিক্ষক ও বয়োজ্যষ্ঠদের প্রতি বিশ্বাসী হওয়া
ষষ্ঠতঃ পুর্বপুরুষদের মন্দির বা শ্মশানাদির পবিত্রতা রক্ষা এবং তাঁদের উদ্দ্যেশ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করা
সপ্তমতঃ নৈতিকতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, ধার্মিক ব্যক্তিদের সন্মান এবং সম্মানিত শিক্ষকদের কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ এবং তাঁদেরকে যথাযথ সন্মানী দেওয়া

বৌদ্ধধর্মে জাতীয় এবং রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির চর্চা যেমন উন্মুক্ত তেমনি ধর্মীয় সংস্কৃতি ও ব্যাপক উৎসবের মাধ্যমে পালিত হয় বৌদ্ধদের প্রধানতম ধর্মীয় উৎসব বুদ্ধ পুর্ণিমা যা সারম্ভরে পালিত হয় জাতিসঙ্ঘসহ বিশ্বব্যাপী যার সাথে জড়িত গৌতম বুদ্ধের জন্ম, পরিনির্বাণ বা মৃত্যু এবং বুদ্ধত্ব লাভের এই ত্রিস্মৃতি এর বাইরে প্রবারণা পূর্ণিমা এবং কঠিনচীবর দানোৎসবও বৌদ্ধদের জাতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এছাড়া সঙ্ঘদান, অষ্ট পরিষ্কারদান বিবাহের সুনির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা বৌদ্ধদের ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কৃতিকে বিশেষভাবে ধারণ করে বৌদ্ধধর্ম মানুষের প্রয়োজনেই ছড়িয়ে পড়েছে দেশে দেশে অহিংসা, সাম্য ও মৈত্রীর সাধনায় মানব প্রগতিকে রক্ষন ও মুক্তিপথের সন্ধানে এগিয়ে নেয়ার প্রত্যয়ে বুদ্ধের সার্বজনিন শিক্ষা বিভিন্ন দেশের স্ব স্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে ধারণ করেই এগিয়ে যাচ্ছে মুক্তিকামী মানুষের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণে

বৌদ্ধধর্মে ব্যক্তি, পরিবার এবং সামাজিক দ্বায়বদ্ধতার প্রতি বুদ্ধের উপদেশ সমুহের অনুসরণ ও প্রতিপালন, উন্নত সমাজ ও সুখী জীবন গঠনে রাখতে পারে অনন্য ভুমিকা বুদ্ধের শিক্ষা অনুসারে আমাদেরকে ছয়টি সত্যের দিক নির্দেশনার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতে হবে তারপর প্রাজ্ঞতা ও ধার্মিকতার মাধ্যমে ওগুলো আচরণ করতে হবে এভাবেই আমরা সকল দুর্ভাগ্যকে অতিক্রম এবং ব্যক্তি, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে সফল ও সার্থক হতে পারব তবে তার আগে আমাদের চারপ্রকার অকুশল কাজ যথাঃ হত্যা, চুরি, ব্যভিচার ও মিথ্যাভাষণ বন্ধ এবং চারিপ্রকার অকুশল মন যথাঃ লোভ, দ্বেষ, মোহ ও ভয় কাতরতা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ছয় প্রকার ধন সম্পদ হানিকর কার্যকলাপে সতর্ক ও বিরতির শিক্ষা নিতে হবে
যেমনঃ
মাদকদ্রব্য সেবনের ইচ্ছা এবং বোকার মত আচরণ
গভীররাত পর্যন্ত জাগ্রত থাকা এবং মনের গভীরতা হারানো
অনিয়ন্ত্রিত সঙ্গীত এবং অশ্লীল বিনোদনের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়া
জুয়া খেলা
খারাপ সঙ্গীদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করা
নিজের কর্তব্য সম্পাদনে অবহেলা

এখন চার প্রকার অকুশল কাজ, চার প্রকার অকুশল মন এবং ছয় প্রকার দোষ নিয়ন্ত্রণের পর আমরা বুদ্ধের ছয়টি দিকের প্রতি যথাযথ মনোযোগ দিতে পারি এখন জানা যাক এই ছয়টি দিকগুলো কি? পুর্বদিক মানে মাতাপিতা এবং ছেলেমেয়ে, পশ্চিমদিক মানে স্বামী এবং স্ত্রী, দক্ষিণদিক মানে শিক্ষক এবং ছাত্রছাত্রী, উত্তরদিক মানে সাধারণ মানুষ এবং তাঁদের বন্ধু, নিম্নদিক মানে প্রভু এবং দাসদাসী আর উর্ধদিক মানে বুদ্ধ ও তাঁর শিষ্যগণ এখানে প্রত্যেকের প্রতি প্রত্যেকের পারস্পরিক শ্রদ্ধা, দায়িত্ব ও কর্তব্য পালেনর মধ্যেই রয়েছে সমৃদ্ধি, সাফল্য এবং সামগ্রিক কল্যাণের অঙ্গীকার বুদ্ধ পারিবারিক মতানৈক্যে একে অন্যকে দোষারোপ না করে প্রত্যেকের নিজের মনকে পরিক্ষার মাধ্যমে সঠিক পথের সন্ধান করার কথা বলেছেন

তাছাড়া ব্যক্তি কল্যাণ ও সামগ্রিক মঙ্গলে মানুষকে আট প্রকার লোক ধর্ম লাভ-অলাভ, নিন্দা-প্রশংসা, আনন্দ-বেদনা এবং সুখ-দুঃখে অবিচলিত থেকে আপন কর্তব্য সম্পাদনের কথা বলেছেন। কারণ বুদ্ধের শিক্ষায় উদ্যমই জীবন, স্থবিরতা জীবন নয় বৌদ্ধধর্ম সহনশীলতা, ক্ষমা এবং সাম্যের আদর্শে মানবতাকেই প্রতিষ্ঠিত করেছে করুনাঘন বুদ্ধ তার উদারতায়, কারণ বুদ্ধের শিক্ষা জগতে শত্রুতার দ্বারা শত্রুতার অবসান হয় না, মিত্রতার দ্বারাই শত্রুতার অবসান হয় পাপীকে নয়, পাপকে ঘৃণা কর এবং মাতা যেমন নিজের জীবন দিয়ে হলেও আপন পুত্রকে রক্ষা করে সেইরূপ সকল প্রাণীর প্রতি অপ্রমেয় মৈত্রীভাব পোষণ করবে তারপর একেবারে নির্দিষ্ট করেই বৌদ্ধদের প্রাত্যহিক প্রার্থনায় সংযুক্ত করেছেন বিশ্বজনীন আকুতি জগতের সকল প্রাণী সুখী হউক বুদ্ধ ছিলেন ধর্মীয় সীমাবদ্ধতার বাইরে বৃহত্তর ঐক্য এবং সম্প্রীতি সংরক্ষনের শ্রেষ্ঠ পথপ্রদর্শক কারণ আমরা বুদ্ধের শিক্ষায় পাই—

বুদ্ধং সরনং গচ্ছামি জ্ঞানের শরণ গ্রহণ করিতেছি
ধম্মং সরনং গচ্ছামি নীতির শরণ গ্রহণ করিতেছি
সংঘং সরনং গচ্ছামি একতার শরণ গ্রহণ করিতেছি

এভাবেই জ্ঞান, নীতি এবং একতার আদর্শকেই বৌদ্ধরা মনে করেন ধর্মের ছায়াতল যেখানে মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সম্প্রীতিতে পায় মনুষ্যত্বের সন্ধান

বৌদ্ধধর্মে হিংসা বিদ্ধেষ পরিহার করে জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চা করা হয়েছে ধর্মাচরনেরই অনুষঙ্গ আমরা দেখি মঙ্গল সূত্রে বুদ্ধ শিক্ষার্থীদের আহ্বান করেছেন বহু শাস্ত্র ও বহু শিক্ষায় প্রশিক্ষিত হতে, বলেছেন মুর্খতা পরিহার করে আত্মদ্বীপ হয়ে নিজেই নিজের অবলম্বন হতে বুদ্ধের শিক্ষায় আমরা জ্ঞান, বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ের গভীরতম ধারণা পাই যেমন মৈত্রী সূত্রে বুদ্ধ বলেছেন দৃশ্যে বা অদৃশ্যে, কাছে বা দূরে সমস্ত প্রাণীর প্রতি অপ্রমেয় মৈত্রীভাব পোষণ করবে অথচ তখন অদৃশ্য কোন প্রাণীর ধারনাটাই ছিল কাল্পনিক যা বিজ্ঞানের কল্যাণে এখন বাস্তব আবার রতন সূত্রে বুদ্ধ কোটি শত সহস্র চক্কবাল বা গ্যালাক্সির কথা বলেছেন যার ধারণা আধুনিক শিক্ষায় বিগত শতকেও ছিল অমুলক আর তা আধুনিক শিক্ষার প্রসারে এখন প্রতিষ্ঠিত সত্য তাছাড়া মনোজগতের শুদ্ধতায় আর আধ্যাত্মিকতার উৎকর্ষে বুদ্ধের আবিষ্কৃত বিদর্শন ভাবনার চর্চা এখন বিশ্বজনীন এবং এর ফল ও প্রভাব বিশ্ব স্বীকৃত বৌদ্ধ ধর্মে মৈত্রীর মাধ্যমেই সমস্ত অশান্তি মোকাবেলার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে যার উদাহরণ আমরা দেখি দস্যু অঙ্গুলিমালকে সঠিক রাস্তায় ফেরাতে এবং বিপদগামী দেবদত্তকে রুখতে, বুদ্ধের অপরিসীম মৈত্রীর প্রভাবে বৌদ্ধধর্মের বিভিন্ন শিক্ষায় শান্তি এবং কল্যাণের পথে মানুষকে অপ্রমত্ততার সাথেই ধর্মাচরণ ও দায়িত্ত্ব পালেনর কথা বলা হয়েছে

বৌদ্ধধর্মে নারী এবং পুরুষের মূল্যায়ন মানুষ হিসেবে, লিঙ্গের পার্থক্যে নয় তারপরও ধর্মে নারী ও পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠায় বুদ্ধ সচেষ্ট ছিলেন বলেই ভিক্ষুসঙ্ঘের পাশাপাশি ভিক্ষুণীসঙ্ঘ গঠন করেছিলেন এবং যেখানে রাজরানী থেকে ভিকারিনী, পতিতা থেকে সতীসাধ্বী সবারই সম্পৃক্ত হওয়ার অধিকার সার্বজনিনভাবেই উন্মুক্ত বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারে নারী ও পুরুষ অবদান রাখতে পেরেছে বৈষম্যহীন উদারতার কারণে সেই জন্যই বৌদ্ধধর্মের ইতিহাসে সুজাতা থেকে বিশাখা, আম্রপালি থেকে কৃশা গৌতমী সবার অবদান এবং অংশ গ্রহণ সর্বস্বীকৃত বৌদ্ধধর্মে ধর্মের নিয়ম কানুন প্রতিপালেন ধ্যান সমাধি এবং ধর্মীয় কৃত্যে নারী পুরুষের সমতা ঐতিহাসিক যা বঞ্চিত নারী অধিকার আদায়ের আন্দলেন বহমান প্রেরনার উৎস বৌদ্ধধর্মে ধর্মীয় উদারতা অবারিত এবং অন্যধর্মের মানুষের প্রতি বৌদ্ধদের মনোভাব, আস্থা, মৈত্রী ও ভালোবাসায় পরিপুর্ণ কারণ বুদ্ধের শিক্ষায় বৌদ্ধরা প্রশিক্ষিত যেখানে ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে বৌদ্ধরা সমবেত উচ্চারণে এই শপথই ধারণ করেন যে সকল ধর্ম অতীতে ছিল, বর্তমানে আছে এবং ভবিষ্যতে উৎপন্ন হবে সকল ধর্মের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা পোষণ করবে কাজেই জ্ঞান নীতি ও ঐক্যের সমন্বয়ে সৌহার্দ্য এবং সম্প্রীতির সার্বজনীন পরিমণ্ডল গড়ে তুলে-শান্তি, সমৃদ্ধি এবং দুঃখ মুক্তির সঠিক পথনির্দেশনা বৌদ্ধধর্মের প্রতিষ্ঠিত আদর্শ
লেখক পরচিতি: ড. জ্ঞান রত্ন মহাথেরো ,সহযোগী অধ্যাপক ,পালি বিভাগ ,চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার:

বৌদ্ধ বিহার, ভিক্ষু ও চিকিৎসা প্রসঙ্গ : ডা. রূপম দেওয়ান



প্রায় আড়াই হাজার বৎসর পূর্বে সিদ্ধার্থ গৌতম বুদ্ধত্ব লাভ করার পর নিজ পিত্রালয়ের বাড়িতে জ্ঞাতি মিলন করেন। এ জ্ঞাতি মিলেনর পরে অনাথপিণ্ডিকের আমন্ত্রণে ভোজন করার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ওই সময়ে জীবক বুদ্ধের চিকিৎসক ছিলেন না। জীবক ছিলেন মগধরাজ বিম্বিসারের রাজচিকিৎসক। তখন অনাথপিণ্ডিকের অনুরোধে রাজা বিম্বিসারের মাধ্যমে বুদ্ধকে চিকিৎসা করে জীবক সুস্থ করে তোলেন। এরপর রাজা বিম্বিসার জীবককে বুদ্ধের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক হিসেবে সেবা করার জন্য হস্তান্তর করেন। বুদ্ধ সুস্থ হবার পর অনাথপিণ্ডিক জেতবন বিহার দান-উৎসর্গ করেন। আবার মগধরাজ বিম্বিসার বুদ্ধকে তাঁর রাজবাড়িতে ফাং বা আমন্ত্রণ করে নিয়ে যান এবং বেণুবন বিহার দান-উৎসর্গ করেন। প্রকৃতপক্ষে জীবক রাজচিকিৎসক হতে বুদ্ধের চিকিৎসক হিসেবে আখ্যায়িত হন। জীবক ছিলেন একজন শৈল্য চিকিৎসক।

প্রাচীন ভারতের চিকিৎসক সংহিতার মধ্যে চরক ছিলেন একজন উল্লেখযোগ্য চিকিৎসক। তাঁরা সমসাময়িক ছিলেন। জীবক চিকিৎসক যা চরক সংহিতায় উল্লেখ আছে। কিছু ইতিহাস টেনে নিয়ে এবার বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চিকিৎসা প্রসঙ্গ তুলে ধরলাম। এই বিষয়ে বর্তমান বিহারগুলোতে ভিক্ষুদেরকে তিনটি বিভাগে বিভক্ত করলাম। যথা : (১) সাধারণ অসুস্থতা, (২) বিশেষ অসুস্থতা এবং (৩) জটিল অবস্থার অসুস্থতা। যে-সকল ভিক্ষুরা অসুস্থ হয়ে পড়েন, অনেক সময় তাঁরা পিণ্ডাচরণ করতে পারেন না। তখন তাঁদেরকে দৃষ্টি আকর্ষণ ও জিজ্ঞাসাবাদ করার পর উপযুক্ত চিকিৎসা দেয়া হলেও একটা বিষয় অজ্ঞাত থেকে যায়। বিষয়টা হলো রোগীর খাওয়াদাওয়া, পথ্যাপথ্যগুলো সঠিকভাবে নির্দেশনা করা হয় না।

প্রচলিত চিকিৎসকরা ওই ব্যবস্থাপত্র অত্যন্ত সীমিতভাবে খাওয়াদাওয়া, পথ্যাপথ্য নির্দেশনা দেন। এতে রোগী পরিপূর্ণভাবে সুস্থতা লাভ করতে পারেন না। রোগী যেই রোগে আক্রান্ত ছিল কোর্স অনুপাতে চিকিৎসা করে ভালো দেখা গেলেও ঠিক দুই মাস পর আবার সেই রোগ দেখা দিল। এমন রোগী ভিক্ষু আমার কাছে আসেন। প্রথম বার ওই ভিক্ষুকে টাইফয়েড (Blood for Salmonila typhi test) করে Positive ছিল। কিন্তু সেই একই রোগ আবার দুই মাস পর পর দেখা দিলে তখন আবার একই Ealamonia পরীক্ষা করে কোনো টাইফয়েড জীবাণু পাওয়া গেল না। Abtibiotic ঔষধ খেলে কিছুদিন বা একমাস সুস্থ থাকার পর আবার বার বার একই জ্বর দেখা দেয়। তখন কোনো আরোগ্য না পেয়ে তাঁকে আমি WIDAL (ভাইডাল Test) দিয়ে দেখলাম। ভাইডাল Test দিয়ে সংখ্যাগুলো দেখা গেল।
            TO-titrc-1:3 60
            AH-titrc-1:3 20
            BH-titrc-1:1 60 = Enteric fever (Antilogyআন্ত্রিক জ্বর)
            TH-titrc-1:1 60

এই সংখ্যাগুলো দেখে রোগীকে রোগ-বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলাম; তিনি বর্ণনা দিলেন পায়খানা দুর্গন্ধ। তরতাজা মাছ রান্না খেয়ে নাকি জ্বর বৃদ্ধি পেয়েছে। সর্বদা শীত করে ভিতরে জ্বর অনুভব। থার্মোমিটারে তাপ কম আসে। এই বিষয়ে আমি জনৈক এল্যোপ্যাথি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে বলেছিলাম, এটা কি জ্বর? বার বার জ্বর আসে। Antibiotic ঔষধ খেলে সাময়িক ভালো থাকে। আবার জ্বর আসে। তিনি আবার Salmonila typhi পরীক্ষা করতে বললেন। পরীক্ষার পর আবার Positive হয়। রোগী ভিক্ষু আর এলোপ্যাথি খেতে রাজি নন।

আমি দেখলাম, Widal test অনুসারে Antibody সৃষ্টি হয়েছে। এখন test-এ টাইফয়েড আসে না। তাই আন্ত্রিক জ্বরের (Enteric fever) চিকিৎসা করে ওই ভিক্ষুকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলি। আবার Salmonila Widal test করে সম্পূর্ণ Negative এসে যায়। এখানে শুধু একজন টাইফয়েড রোগী নিয়ে আলোচনা করলাম। দেখলাম, একজন টাইফয়েড রোগীর পুরাতন অবস্থায় Antibody হয়ে আন্ত্রিক জ্বর আসে। হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসাতে রোগ-রোগী বিশেষে পথ্যাপথ খাওয়া ঠিকভাবে পালন করলে প্রকৃত আরোগ্য লাভ করা যায়। নতুন বা পুরাতন টাইফয়েড হোক, ঠিকমতো বাছা করে না খেলে আরোগ্য লাভ করা সম্ভব হয় না। বর্তমান জগতে নতুন নতুন রোগ এবং বিচিত্র ধরনের রোগী দেখলে অবাক হতে হয়।

এলার্জি, দাদ, গোলাকৃতি চুলকানি চর্মরোগ, ব্রণ, এলার্জি-ব্রণ, খোসপাঁচড়া, সোরাইসিস, SLE ইরিথিমা, ছৈয়দ কদমা, কালোতিল জড়ুল, আঁচিল, জোটনাল ওয়ার্ট (যৌনাঙ্গে আচিল), শ্বেতী রোগ, গলিত কুষ্টরোগ, ধবল কুষ্ঠ ব্যাধি, (আর্টিকেরিয়া/আমবাত/পিপঁড়াডাম) লম্বা আকৃতি চুলকানি চর্মরোগ, বিষাক্ত চর্মক্ষত, রনঝড়ে। চর্ম ক্যান্সার, হার্পিস সিমপ্লেক্স (মুখমণ্ডলে জলফোসকা), হার্পিস জোষ্টার (বড় বড় ফোসকা)। ইম্পিটিগো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ফোসকা (কটুজৌন্য) ঘামাচির মতো ও ফোসকার মতো দেখতে। পায়ে ও হাতের আঙ্গুলে হাজা (পাকুই, পাক্কো); বার্জার ডিজিস (ঘা-পাক্কো), অর্থাৎ হাতে বা পায়ে আঙ্গুলে ঘা বড় ক্ষত হয়ে আঙ্গুল ছিড়ে যায়। এই রোগটি সাধারণত ধুমপানের কারণে হয়ে থাকে। যতগুলো চর্মরোগের বিবরণ দিলাম সকল লোকেরই এগুলো কমবেশি থাকে। যে-কোনো চর্মরোগ যদি ভিক্ষুদের হয়ে থাকে তখন যে-কোনো এলার্জি জাতীয় খাদ্য খেলে বাড়ে (Food Allergy)

কোনো কোনো রোগের সাথে Food Allergy-এর সম্পর্ক নেই, খেলেও বাড়ে না। Indian ডাক্তারেরা খাওয়াদাওয়া, পথ্যাপথ্য বিষয়ে একটা গাইড বুক দিয়ে দেয়। আমি নিজেই Pypass (হার্ট সার্জারী) করেছিলাম। আমাকে পথ্যাপথ্য বিষয়ে একটা সুন্দর গাইড বুক দেয়া হয়েছিল। এখন, আমাদের বৌদ্ধ বিহারগুলোতে চিকিৎসা তদারকি কমিটি নেই। তাছাড়া শ্রদ্ধেয় ভন্তে রা বলতে পারেন না যে আমি এটা খেতে পারি না, ওটা খেতে পারি না। মোটকথা নিজে খুঁজে খাওয়ার বিধান নেই। রোগী ভিক্ষুদের জন্য ছোয়েং-এ দায়ক-দায়িকারা কী কী খাবার দেয়া উচিত তার কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা নেই। রোগ ও রোগী বিশেষে খাদ্য-পথ্য নির্বাচন করে দেয়া শ্রেয়। নিরামিষ ও আমিষ উভয়টাই প্রয়োজন রোগী বিশেষে। ১৯৯২ সালে কলকাতায় নিউট্রিশন পুষ্টিতত্ত্ব শীর্ষক সেমিনার হয়আমিষ বনাম নিরামিষ।

 অনেক বিতর্কের পর নিরামিষ জয় লাভ করলো। তবে বর্তমান যুগের প্রেক্ষিতে জটিল জটিল রোগ-বিবর্তনের ফলে নতুন নতুন প্রযুক্তি, ঔষধ, অপারেশনের জন্য উন্নত যন্ত্রপাতি বের হচ্ছে। তাই বলতে হয়, আমিষ খাদ্যও একেবারে বাতিল করা যায় না। আমিষেরও প্রয়োজন আছে। রোগ-রোগীর বিশেষে খাদ্য পথ্যাপথ্য রোগী ভিক্ষুদের ব্যবস্থা করে দেয়া উচিত। অসুস্থ ভিক্ষুদের পিণ্ডচরণে না গিয়ে বিহারে যথোপযুক্ত ভোজন করা দরকার। সুস্থ ভিক্ষুরা এ বিষয়ে রোগীদের যথাসম্ভব সহযোগিতা করতে পারেন। প্রাচীন ভারতীয় সন্ন্যাসীরা নিরামিষ খেয়ে দীর্ঘায়ু লাভ করেছিলেন। আমি নিম্নে পথ্য ও খাদ্যের তালিকার বিবরণ দিলাম। চিকিৎসা তদারকি কমিটির লোকেরা ব্যবস্থাপনা নিতে পারেন।

উদ্ভিদ জাতীয় খাদ্যের তালিকাশীতের মৌসুমে: ফুলকপি, বাধাকপি, মুলা, মুলা শাক, শস্য শাক, কপি শাক, রায় শাক, ঢেঁকি শাক, লাল শাক, আলু, পেঁপে। সবুজ বেগুন, কালো বেগুন, জুম্ম বেগুনযাদের এলার্জি আছে তারা এগুলো খেতে পারবেন না। মোটকথা যাদের চুলকানি, চর্মরোগ, খোসপাঁচড়া, দাদ আছে তাদের কচু, কচুর লতি, তিতা করলা, সিগন শাক, তিতা শাক, তিতা কচু খাওয়া নিষেধ। ঢেড়স, গাজর, শালগম খাবেন। যাদের এলার্জি নেই তারা খাবেন। যাদের থাইফয়েড, গলগণ্ড রোগ আছে তারা গাজর, শালগম, বাধাকপি, কাঁচা পেঁয়াজ, খাওয়া নিষেধ। জংলী আলু, মাটির নিচের জিনিস খাওয়া নিষেধ।

যেগুলো খাবেন : থাইরয়েড সমস্যায় প্রচুর সামুদ্রিক মাছ, পেঁপে, শিম, ঢেড়স খাবেন। ঝিংগা, চিচিংগা, পটল, লাল শাক, শস্য শাক, পালং শাক, মুলা, শসা, ফল জাতীয় খাবার, আলু, বেগুন, কচু, মুরগির মাংস খাবেন। যাদের বাতের ব্যথা আছে তারা খাবেন না : মিষ্টি লাউ, কদু কুমড়া, খনাগুলা, বিলাতি ধন্যাপাতা, কলাটেটার, পুই শাক, তিতা করলা, তিতা শাক, কলমি শাক, কদু শাক, ইলিশ মাছ, হাঙ্গর মাছ, তেলাপিয়া মাছ, কাতাল মাছ, বোয়াল মাছ, বাচা মাছ, চিতল মাছ। যাদের বাতের ব্যথা নেই তারা খাবেন : ঝিংগা, চিচিংগা, কয়দা, পরোল, পটল, মসুর ডাল, লাল মারেস শাক, সবুজ মারেস শাক, ডাটা লাল শাক, ময়লা শাক, টেংরা মাছ, কেচকি মাছ; সেই সাথে ছোট ছোট চিংড়ি মাছ মিশ্রিত থাকে এগুলো বেছে ফেলে দিবেন। যাদের হাই-প্রেসার আছে তারা দেশী মুরগির ডিম খেতে পারবেন না। ফার্মের ব্রয়লার ডিম ক্ষতিকর। দেশী মুরগির মাংস, মুরগির জুস চলবে।

Flatulence with ulcerগ্যাস্ট্রাইটিস ও গ্যাস্ট্রিক আলসারের জন্য যাদের পেতে গ্যাস জমে, ঢেকুর, চুকা ঢেকুর, টক ঢেকুর হয়; পেট-ডাক মারে, বমি বমি ভাব, বদহজম, বদ্ধ বায়ু (Bowel gas) অরুচি হয়, পায়খানা কখনো শক্ত কখনো নরম, কোষ্ঠকাঠিন্যতা বা Gas formation হয় তারা মিষ্টি লাউ, কুমড়া, বড় আলু, জংলী আলু, টমেটো, টক খাদ্য, মালতা, লেবু, জাম্বুরা, তেতুল, তিতা কচু, কচুলতি, সিগন শাক, তিতা করলা, ছাগলের মাংস, শুকর মাংস, হাঁসের মাংস, শামুক, কাঁকড়া, মরিচ খুব সীমিত খাবেন। যেগুলো খাবেন : আলসারে কাঁচা মরিচ, তরকারি খুব কম খাবেন। ভাত খাওয়ার পর কমলা, আপেল, কালো জাম, ডালিম/আনারস খাবেন। আলসারে নরম ভাত, লঘু পথ্য, হালকা তরকারি খাবেন; বাতের বেদনায় যে-সব খাদ্য খাওয়ার কথা লেখা আছে সেগুলো খাবেন। এখানে আর লেখলাম না।

হার্টের রোগীর জন্য সমস্ত চর্বিযুক্ত খাদ্য, মাংস, বেশি তৈলাক্ত খাদ্য বর্জনীয়। সিদ্ধ খাবার সবচেয়ে ভালো, সিদ্ধ চাউল। খাওয়া নিষেধ : ডিমের লাল কুসুম, চিংড়ি মাছ, মাটির নিচে উৎপন্ন খাদ্যজংলী আলু, বড় আলু, মিষ্টি আলু। রাতে ভাত না খাওয়া। সকালের নাস্তা আটার রুটি, রাতেও রুটি, দুপুরে ভাত, অথবা সকালে বা দুপুরে সিদ্ধ চাউলের ভাত। ভারতের বিখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দেবী শেঠী বলেছেন, সিদ্ধ চালের ভাত, সিদ্ধ তরকারি রান্না সবচেয়ে ভালো; যত প্রকার ফ্যাটমুক্ত তেল হোক না কেন, তেলের নামই তেল থাকে। কথা হলো মানুষের বর্তমান সামাজিক জীবনধারার মধ্যে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কোনো তেল ছাড়া রান্না হয় না। ইন্ডিয়ার ফরচুর তেল, মালয়েশিয়ার সান ফ্লাওয়ার তেল, ইতালির সান ফ্লাওয়ার তেল দিয়ে যদি রান্নার ব্যবস্থাপনা হয়, তবে তেমন কোনো ঝুকি থাকবে না। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশের সয়াবিন ও সরিষার তেলে প্রচুর পরিমাণে কোলেস্টেরল থাকে।

আজকাল সরিষার তেলও প্রচুর ভেজালযুক্ত, ৫০% রং দেয়া থাকে। কার্বোহাইড্রেট বা শ্বেতসার জাতীয় খাদ্য না খাওয়া ভালো। নতুন চালের ভাতে প্রচুর কার্বোহাইড্রেট থাকে। গরুর দুধ, কাঁচা লবণ, চানাচুর, বাটার বন, চিপস, নুডুলস্, বিনি চালের ভাত খাওয়া নিষেধ। যেগুলো খাবেন : শাকসবজি, পটল, ঝিংগা, চিচিংগা, পেঁপে, পরোল, সীম, ছোলা, ফুলকপি, বাধাকপি, লাল শাক, মুলা, মসুর ডাল, কলা খাবেন। মুরগির মাংস, কবুতরের মাংস, আপেল, কমলা, আঙ্গুর, কালো জাম, মালতা, লো-ফ্যাট দুধ ডায়েট খাবেন। যেমন : MARK দুধ (Made in Australia) দুধ খাবেন; কোলেস্টেরল খুব কম থাকে এবং ক্ষতি করে না। মাসে তিনটা দেশী মুরগির ডিম খাওয়া যাবে। মোটকথা যেগুলোর বিবরণ দেয়া হলো সেগুলো লঘু পথ্য ও মধ্যম পথ্য হিসেবে খাওয়া যাবে।

রোগী ভিক্ষুদের জন্য দরকারী পথ্যাপথ্য বিষয় এখানেই শেষ করলাম। এছাড়া আরেকটা বিষয়ে আলোচনা করা যাক। যাদের পুরাতন সর্দিকাশি (Cold allergy Sinusitis), সর্দি প্রদাহ, Tonsil বড় হওয়া, ব্যথা করা, গলা ব্যথা করা, ডাষ্ট এলার্জি আছে তাদের অনেক নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। এসব রোগে হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করে স্বাভাবিক থাকা যায়। তৃতীয় ও চতুর্থ বিশ্বের দেশগুলোর লোকদের এই রোগগুলো বেশি হয়। পরিবেশ দূষণ, ধুলাবালি, ঠাণ্ডা আবহাওয়া, বৃষ্টিতে ভেজা এবং ঘর ও বিছানাপত্র ঝাড় দেয়া, ঘর ও উঠান ঝাড় দেয়া থেকে নাকে, চোখে, কানে ধুলাবালি প্রবেশ করে থাকে। দীর্ঘ দিন এমন পরিবেশে থাকলে সাইনোসাইটিস, নাকে পলিপ (মাংস বৃদ্ধি), নাসিকার হাড় বড় হয়ে বক্র হয়, Adenoid gland swell হয়। গলায় টনসিলে Infection  হয়, ব্যথা হয়, ফুলে যাওয়া, জটিল হয়ে যায়, পরে টনসিল অপারেশন করতে বাধ্য হয়। এতে মাথা টনটন করে, গলায় কফ, শ্লেষ্মা, কাশি হয়, মোটেও ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারে না। গরমে আরাম বোধ করে। স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যায়।

প্রতিকার: রাস্তায় যাওয়ার সময় মাস্ক লাগাবেন। ঘরে ঝাড় দেয়ার পূর্বে ও গোসল করার পূর্বে দুই কানে তুলা দেবেন। মাঝে মাঝে ভালো (Cotton bud)  দিয়ে হালকাভাবে কান পরিষ্কার করবেন। ফ্রিজের পানি (Cold water) মাখন, ঘি, বাটার বন, চাম্পা কলা, সাগর কলা, কচু, কচুলতি, ঢেঁড়স চিকিৎসা চলাকালীন পর্যন্ত খাবেন না। ভালো হলে খাওয়া যাবে। তবুও খাদ্য সীমিত আকারে খেতে হবে।

চিকিৎসা: হোমিওপ্যাথি চিকিৎসায় দীর্ঘকাল উপশম থাকা যায়। ময়লাযুক্ত পরিবেশ ও ধুলাবালি থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করবেন। বিশুদ্ধ পরিবেশে থাকবেন। প্রতিদিন শোয়ার পূর্বে একটা বড় চীনামাটির মগে গরম পানি নিয়ে রুমাল বেড়িয়ে নাক পর্যন্ত ঢেকে শ্বাস (গরম পানির ভাপ) টানবেন এবং নিশ্বাস ফেলবেন কমপক্ষে ৫ মিনিট পর্যন্ত। নাক থেকে অনেক ময়লা বের হয়ে যাবে। প্রতি রাতে ৫ মিনিট এভাবে করলে ভালো থাকা যায়। একই সঙ্গে হোমিওপ্যাথি ঔষধ খেলে সুস্থ থাকা সম্ভব।
জয়তু বুদ্ধ সাসনম্‌

? লেখক পরিচিতি : ডা. রূপম দেওয়ান, বিশিষ্ট হোমওিপ্যাথি চিকিৎসক, রাঙামাটি।

শেয়ার:

মানহীনের অনাগামীতা : উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু



মহাকারুণিক বুদ্ধ দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে যে ধর্মবিনয় প্রচার করেছিলেন তার চরম লক্ষ্য হচ্ছে নির্বাণ। এই নির্বাণ লাভ করতে হলে দশ সংযোজন ছিন্ন করতে হয়। সেগুলো হচ্ছে: সৎকায় দৃষ্টি, বিচিকিৎসা, শীলব্রত পরামর্শ, কামরাগ, ব্যাপাদ, রূপরাগ, অরূপরাগ, মান, ঔদ্ধত্য ও অবিদ্যা। এখানে সৎকায় দৃষ্টি হচ্ছে আমিত্বের ধারণা। পঞ্চস্কন্ধকে (নাম, রূপ, বেদনা, সংজ্ঞা, সংস্কার ও বিজ্ঞান) আমি আমার-রূপে ধারণ করা। বিচিকিৎসা হচ্ছে সন্দেহ  নিজেকে নিয়ে ১৬ প্রকারের সন্দেহ, অন্যদিকে বিভিন্ন বিষয়ে আরো আট প্রকার সন্দেহ।

শীলব্রত হচ্ছে বিভিন্ন বিষয়কে ব্রত ধরে বিমুক্তি লাভের চিন্তা করা; সোজা কথায় বিভিন্ন মানতাদি করা, দেবদেবীর আশ্রয় নেওয়া, কৃচ্ছ্রতাসাধন করা ইত্যাদি। কামরাগ হচ্ছে পঞ্চকামগুণ চরিতার্থ করার প্রবল ইচ্ছা যা কামলোকে বার বার জন্মগ্রহণ করায়। ব্যাপাদ হচ্ছে হিংসা, ক্রোধ; নিজেকে নিয়ে, নিজের প্রিয়জনকে নিয়ে এবং নিজের শত্রুকে ঘিরে এই ব্যাপাদ বেশি আবর্তিত হয়। রূপরাগ আর অরূপরাগ হচ্ছে যথাক্রমে রূপলোক (রূপ ব্রহ্মলোক) আর অরূপলোকে উৎপন্ন হয়ে সুখ ভোগ করার ইচ্ছা। মান হচ্ছে একপ্রকার অহংকার যা অন্যের সঙ্গে তুলনা করে নিজেকে শ্রেষ্ঠ বলে দাবী করতে শেখায়। ঔদ্ধত্য হচ্ছে চিত্তের অস্থিরতা। অবিদ্যা হচ্ছে অজ্ঞতা যা সত্যকে সত্য বলে জানতে দেয় না।

এই দশটি সংযোজনের মধ্যে সৎকায় দৃষ্টি, বিচিকিৎসা, শীলব্রত পরামর্শ ক্ষয় হলে বা ছিন্ন হলে তাঁকে স্রোতাপত্তি ফললাভী বলা হয়। এই তিনটি ক্ষয়ের পাশাপাশি যাঁর কামরাগ, ব্যাপাদ ক্ষীণ হয়ে যায় তাঁকে সকৃদাগামী; যাঁর কামরাগ ও ব্যাপাদ সমূলে ধ্বংস হয় তাঁকে অনাগামী আর যিনি দশটি সংযোজন সমূলে ধ্বংস করেছেন তাঁকে বলা হয় অর্হৎ। তথাগত বুদ্ধ পর্যায়ভেদে দেশনা করেন। শ্রোতার গ্রহণের সামর্থ্য ভেদেও দেশনা করেন। আর তাই বেদনাকে কোথাও তিন প্রকার বলেছেন, কোথাও আবার নয় প্রকার বলেছেন। চিত্তকে কোথাও ৮৯ প্রকার বললেও কোথাও তা আবার ১২১ প্রকারে বিস্তৃত হয়েছে।

ইতিপূর্বে উল্লেখ করেছি যে, সৎকায় দৃষ্টি, বিচিকিৎসা, শীলব্রত পরামর্শ, কামরাগ, ব্যাপাদ সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হলেই ব্যক্তির অনাগামী ফল লাভ হয়। কিন্তু এসবের বাইরে গিয়ে তথাগত বুদ্ধ মানকে অন্যরকম গুরুত্ব দিয়েছেন।  তথাগত বুদ্ধ মান সূত্রে বলছেন, হে ভিক্ষুগণ, একটি ধর্ম পরিত্যাগ কর। আমি তোমাদের অনাগামীতার প্রতিভূ রইলাম। সেই একটি ধর্ম কী? সেই একটি ধর্ম হচ্ছে মান ধর্ম। তথায় উল্লেখিত হয়েছে :

মানে মত্ত জান, সকল মানবগণ,
মান গ্রন্থিতে বদ্ধ সদা প্রমত্ত মন;
না জেনে সম্যকভাবে এই অহংকার,
পুনঃ আসিতে হয় এই ভব-সংসার।
যিনি এই অহংকার ত্যজিয়ে ভুবনে,
বিমুক্ত হয়ে বিচরে অহংকার বিনে;
অহংকার গ্রন্থি ছিন্ন করে অতঃপর,
দুঃখমুক্ত হন তিনি শান্তি নিরন্তর।

মানের কারণে যে বিমুক্তি সুদূর পরাহত হয় তার একটি আখ্যান বলছি : অতীতে পোট্ঠিল নামে একজন স্থবির ছিলেন। তিনি সাতজন বুদ্ধের শাসনে ত্রিপিটকধর ছিলেন। ত্রিপিটকধর হওয়ার কারণে তাঁর মধ্যে একপ্রকার মান কাজ করত। মহাকারুণিক বুদ্ধ ভাবলেন, এই ভিক্ষুর নিজের আত্মমুক্তির কোনো চিন্তা নেই। আর তাই তার মধ্যে সংবেগ উৎপন্ন করার জন্য বলতে লাগতে লাগলেন, এসো তুচ্ছ পোট্ঠিল, বন্দনা কর তুচ্ছ পোট্ঠিল, বস তুচ্ছ পোট্ঠিল। পোট্ঠিল স্থবির ভাবলেন, আমি সম্পূর্ণ ত্রিপিটক ধারণ করি; ভিক্ষু এবং দায়ককে ধর্ম ব্যাখ্যা করি; তথাপি শাস্তা আমায় কথায় কথায় তুচ্ছ তুচ্ছ বলে সম্বোধন করছেন। নিশ্চয়ই আমার ধ্যান-সাধনা নেই বলেই শাস্তা এমনটা বলছেন। এই সংবেগ উৎপন্ন করে তিনি অরণ্যে গিয়ে সাধনা করার জন্য মনস্থির করলেন। অরণ্যাচারী হওয়ার জন্য পরদিন তিনি রওয়ানা দিলেন।

তিনি ১২০ যোজন হেঁটে ত্রিশজন ভিক্ষু অবস্থান করেন এমন এক অরণ্যে গিয়ে উপস্থিত হলেন। সেখানকার সংঘপ্রধানকে বললেন, ভন্তে , আমাকে আশ্রয় দান করুন। আমাকে শরণ দান করুন। প্রত্যুত্তরে সংঘপ্রধান বললেন, আবুসো, তুমি তো ধর্মকথিক। আমাদের তো তোমার কাছে কিছু জানবার থাকতে পারে। এই বলে তিনি তাঁর কনিষ্ঠ ভিক্ষুর কাছে পোট্ঠিলকে পাঠালেন। এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, ওই অরণ্যে অবস্থানরত ত্রিশজনের সকলেই ক্ষীণাস্রব (অর্হৎ) ছিলেন। তাঁরা পোট্ঠিল-এর ভেতরে সুপ্তাকারে থাকা মানের কথা বুঝতে পেরে মান কমানোর জন্য একজন আরেকজনের কাছে পাঠিয়ে দেন। প্রথমজন দ্বিতীয় জনের কাছে পাঠিয়ে দেন, দ্বিতীয় জন তৃতীয় জনের কাছে, তৃতীয় জন চতুর্থ জনের কাছে, এভাবে সর্বশেষ ত্রিশতম জনের কাছে পাঠিয়ে পোট্ঠিল-এর মান দূরীভূত করেন।

ত্রিশতম জন হচ্ছেন একজন সাত বছরের শ্রমণ। তিনি তখন সেলাইয়ের কাজ করছিলেন। এমন সময় পোট্ঠিল তাঁকে বললেন, আপনি আমাকে শরণ দান করুন। শ্রমণ বললেন, অহো আচার্য, আপনি বয়স্ক, বহুশ্রুত, আপনার কাছে অনেক কিছু জানার থাকতে পারে। পোট্ঠিল বললেন, এরূপ বলবেন না, আমাকে আশ্রয় দিন। তখন শ্রমণ বললেন, যদি উপদেশ পালেন সক্ষম হন তাহলে আশ্রয় প্রদান করব। পোট্ঠিল বললেন, আমি উপদেশ পালন করব। আপনি আগুনে প্রবেশ করতে বললে তাই করব। শ্রমণ পোট্ঠিল-এর শরীরে দামী চীবর দেখে সেটা দিয়েই উপদেশ পালেন সক্ষম কিনা পরীক্ষা করতে চাইলেন। আর এজন্য পোট্ঠিলকে বললেন, চীবরগুলোসহ ঐ সরোবরে নামুন। ভন্তে  তাই করতে গেলেন। চীবর সামান্য ভেজা মাত্রই শ্রমণ ভন্তে কে ওঠে আসতে বললেন।

শ্রমণ তখন ভন্তে কে উপদেশচ্ছলে বললেন, একটি বল্মীকে (উইয়ের ঢিবি) ছয়টি ছিদ্র আছে। সেখানে একটি গুই সাপ প্রবেশ করল। এখন কেউ যদি সেই সাপকে ধরতে চায় তবে তাকে পাঁচটি ছিদ্র বন্ধ করতে হবে আর ষষ্ঠ ছিদ্র দিয়ে গুই সাপটিকে ধরতে হবে। তদ্রুপভাবে পঞ্চদ্বারকে বন্ধ করে কেবল মনোদ্বার দিয়েই কর্ম সম্পাদন করুন। এই অল্প কথাতেই বহুশ্রুত পোট্ঠিল স্থবিরের জ্ঞানপ্রদীপ যেন প্রজ্জ্বলিত হলো। এদিকে তথাগত ১২০ যোজন দূর হতে সেই ভিক্ষুর সঙ্গে যেন সরাসরি কথা বলছেন, এভাবে গাথায় প্রকাশ করলেন, যোগ (মনসংযোগ) ধ্যান হতে জ্ঞান উৎপন্ন হয়, অযোগ হতে জ্ঞানের ক্ষয় হয়। প্রজ্ঞাবৃদ্ধি ও প্রজ্ঞাক্ষয়ের এই দুই উপায় জ্ঞাত হয়ে যাতে প্রজ্ঞা বৃদ্ধি পায় তদ্রুপ কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখবে। গাথার মর্মার্থ অনুধাবনে পোট্ঠিল স্থবির অর্হত্তফলে প্রতিষ্ঠিত হলেন।

প্রিয় পাঠক, একজন সম্যক সম্বুদ্ধের সান্নিধ্য পেলেই যেখানে অসংখ্য ব্যক্তি বিমুক্তির সাধ পায়, সেখানে এই পোট্ঠিল স্থবির সাতজন সম্যক সম্বুদ্ধের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, প্রতিবারেই তিনি ত্রিপিটকধর ছিলেন। অথচ এই মানের কারণে তিনি বিমুক্তির স্বাদ পাননি। অর্থাৎ বিমুক্তির পথে অনেক বড় একটি বাধা এই মান। সংযুক্তনিকায়ের সগাথা বর্গে এই মানকে কাঁধের জোয়ালের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।

মানকে পর্যায়ভেদে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করা যায়। মান দুই প্রকার, যথা : আত্মপ্রশংসা প্রবণতা ও পরনিন্দা প্রবণতা। মান তিন প্রকার, যথা: আমি শ্রেয়, আমি সদৃশ, আমি হীন। আবার চার প্রকারে মান উৎপন্ন হয়, যথা: লাভের কারণে, যশের কারণে, প্রশংসার কারণে, সুখের কারণে। মান আবার ছয় প্রকারে উৎপন্ন হয়, যথা: চক্ষুসম্পদের কারণে, শ্রোত্রসম্পদের কারণে, ঘ্রাণসম্পদের কারণে, জিহ্বাসম্পদের কারণে, কায়সম্পদের কারণে, মন সম্পদের কারণে। মান আবার সাত প্রকার: মান, অতিমান, মানাতিমান, অবজ্ঞামূলক মান, অধিমান, আত্মশ্লাঘা, মিথ্যামান। মান ও দেমাগ (অহংকার) ভেদে পুনরায় আট কারণে উৎপন্ন হয়। যেমন: লাভের কারণে মান, অলাভের কারণে দেমাগ, যশের কারণে মান, অযশের কারণে দেমাগ, প্রশংসার কারণে মান, অপ্রশংসার কারণে দেমাগ, সুখের কারণে মান, দুঃখের কারণে দেমাগ। মান পুনরায় নয় প্রকার: (১) আমি শ্রেয়ের শ্রেয় মান, (২) আমি শ্রেয় সদৃশ মান, (৩) আমি শ্রেয়ের চেয়ে হীন মান, (৪) আমি সদৃশের চেয়ে শ্রেয়, (৫) আমি সদৃশের সদৃশ মান, (৬) আমি সদৃশের চেয়ে হীন মান, (৭) আমি হীনের চেয়ে শ্রেয় মান, (৮) আমি হীনের সদৃশ মান, (৯) আমি হীনের অপেক্ষা হীন মান। মান দশ প্রকার। এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি জাতি, গোত্র, কুলপুত্র, সৌন্দর্য, ধন, শিক্ষা, কর্মায়তন (উন্নত পেশা), শিল্পায়তন (শিল্পবিদ্যা), বিদ্যাস্থান (গবেষণা বা উন্নত বিদ্যা), শ্রুত বিষয় এবং প্রতিভাণ (প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব)। মানকে আরো পাঁচ শ্রেণিতে ব্যাখ্যা করা যায়। যথা : (১) শক্তি মদে মত্ত মানী, (২) ধন মদে মত্ত মানী, (৩) বিদ্যা মদে মত্ত মানী, (৪) কীর্তি মদে মত্ত মানী, (৫) ঋদ্ধি মদে মত্ত মানী।

শক্তি মদে মত্ত মানী: নিজেকে বলবান, স্বাস্থ্যবান, শক্তিবান মনে করে অনেকে এই শক্তি মদে মত্ত হয়ে মান প্রকাশ করে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে এই শক্তি হারিয়ে যায়। সব শক্তি হারিয়ে আমাদের লাঠিতে ভর দিয়ে চলতে হয়। কেউ বা আবার বিছানায় শয্যাশায়ী হয়ে যায়। বিছানা থেকে নিজে নিজে ওঠার মতো শক্তিও অবশিষ্ট থাকে না।

ধন মদে মত্ত মানী: কেউ কেউ সম্পদের মালিক হয়ে মান দেখায়। অথচ ধনী থেকে গরীব হতে সময় লাগে না। ধনের কারণে মানী হওয়া এই ব্যক্তিরা সেটা বুঝতে পারেন না।

বিদ্যা মদে মত্ত মানী: কেউ কেউ উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মানী হয়ে ওঠেন। তুলনামূলক কম শিক্ষিত ব্যক্তিদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে কথা বলেন।

কীর্তি মদে মত্ত মানী: নিজের করা নানা কাজের কারণেও অনেকে মানী হয়ে ওঠেন। নিজেদের কীর্তি যেন নিজেদের বিপদ ডেকে আনে এই কীর্তিমানদের।

ঋদ্ধি মদে মত্ত মানী: শমথ ভাবনা করলে পঞ্চাভিজ্ঞাসহ নানাপ্রকার ঋদ্ধি উৎপন্ন হয়। কেউ কেউ এই ঋদ্ধির কারণে মানী হয়ে ওঠেন। ফলে ঋদ্ধিমানের এই মান বিমুক্তি লাভের অন্তরায় হয়ে ওঠে। মান তাকে নিচের দিকে টেনে ধরে। সম্যক পথে এগিয়ে যেতে দেয় না।

মান বিসর্জনের জন্য তথাগত ছয়টি বিষয় অনুশীলন করতে বলেছেন। যথা : অনুত্তর দর্শন, শ্রেষ্ঠ শ্রবণ, শ্রেষ্ঠ লাভ, শ্রেষ্ঠ শিক্ষা, শ্রেষ্ঠ পরিচর্যা এবং  শ্রেষ্ঠ গুণ অনুস্মরণ।
পুনরায় মান বিসর্জনের জন্য ছয়টি বিষয় অনুশীলন করতে বলেছেন। যথা : বুদ্ধানুস্মৃতি, ধর্মানুস্মৃতি, সংঘানুস্মৃতি, শীলানুস্মৃতি, ত্যাগানুস্মৃতি এবং দেবতানুস্মৃতি।
পুনরায় মান বিসর্জনের জন্য ছয়টি বিষয় অনুশীলন করতে বলেছেন। যথা : অনিত্য সংজ্ঞা, অনিত্যে দুঃখ সংজ্ঞা, দুঃখে অনাত্ম সংজ্ঞা, প্রহান সংজ্ঞা, বিরাগ সংজ্ঞা এবং নিরোধ সংজ্ঞা।

বিভিন্ন কারণে যাদের মাঝে নানাপ্রকার মান বিদ্যমান থাকে তারা বিমুক্তি থেকে দূরেই বলা চলে। শুরুতেই বলা হয়েছে, মান ত্যাগ করতে পারলে তথাগত অনাগামীতার প্রতিভূ বা অনাগামী লাভের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। আর তাই আমাদের  মান ত্যাগ করতে হবে। মানের কারণে তুচ্ছ বিষয় নিয়েও অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটে যায়। সে আমাকে সবার সামনে অপমান করেছে; আমি এর শেষ দেখে নেবএভাবে মানের কারণে ক্রোধ উৎপন্ন হয়। সেই ক্রোধ বা রাগ আগুনের চেয়েও ভয়াবহ। এই ক্রোধের কারণে যে প্রতিশোধ-পরায়ণতা উৎপন্ন হয় তা এক সময় মানুষ হত্যার মতো ঘটনাও ঘটাতে পারে। অতএব ইহকাল ও পরকাল উভয়কালের সুখের জন্য, চলুন, মান ত্যাগ করি।
সকলেই প্রজ্ঞা লাভ করুক,
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক।
? লেখক পরিচিতি: উজ্জ্বল বড়ুয়া বাসু, সভাপতি, ত্রিপিটিক রিচার্চ সোসাইটি, চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ। সরকারী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট, হাইর্কোট বিভাগ ঢাকা।

শেয়ার:

ফটোগ্রাপি

জনপ্রিয় পোষ্ট

অনুসরণ করুন

facebook

ক্যাটাগরি

    প্রবন্ধ

সাম্প্রতিক পোষ্ট

অন্যান্য সাইট

  • Suttacentral
  • Kalpataruboi
  • Dhammatext

Featured Post

একটু সহানুভূতি : শ্রীমৎ অভিজ্ঞানন্দ ভিক্ষু

হে প্রভু—— মানবতার আকাশে আজ আগের মতো হয় না সোনালী স্নিগ্ধ ভোর জটপাকে কেটে যায় সময়ের প্রতিটি শাশ্বত প্রহর এ কেমন ঘোর, কী নিদা...

Pages

Theme Support

Need our help to upload or customize this blogger template? Contact me with details about the theme customization you need.