শুভ বুদ্ধপূর্ণিমা বিশ্ববৌদ্ধদের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্মীয় উৎসব। এ দিনটি বিশ্ববৌদ্ধদের নিকট পবিত্র ও মহিমান্বিত দিন। ভগবান বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমার বিশাখা নক্ষত্রে রাজকুমার সিদ্ধার্থরূপে কপিলাবস্তু লুম্বিনী কাননে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে আলোকপ্রাপ্ত অর্থাৎ সর্বতৃষ্ণা ক্ষয় সাধন করে বোধিজ্ঞান লাভ করে জগৎপূজ্য ‘বুদ্ধ’ হয়েছিলেন। বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে মহাপরিনির্বাণ লাভ করেছিলেন। বুদ্ধের জীবনে মহাপবিত্র ত্রিস্মৃতি বিজড়িত বুদ্ধপূর্ণিমা বৌদ্ধদের নিকট অতি গৌরবের ও মহাপবিত্র দিন হিসেবে উদ্যাপিত হয়। শুভ বুদ্ধপূর্ণিমার আলোকে অহিংসিত হয়ে কীভাবে আমাদের জীবন গঠন করা যায় তা আলোকপাত করব।
শুধু বিশেষ আকার বা একটি কাঠামোর জন্য মানুষ ‘মানুষ’ হিসেবে বিবেচিত হন না। মানুষ হিসেবে আমাদের রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তি নামক বিশেষ একটি গুণ, যার ধর্ম হলো যে কোনো বিষয়ে আমাদের বিচারের ক্ষমতা বা মূল্যায়নের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য।
আজ থেকে আড়াই হাজার বছররেও পূর্বে এ ভূভাগে জন্ম নেয়া তথাগত বুদ্ধ দাবী করেছিলেন— সর্ব জীবের স্ব স্ব স্থানে স্বাধীন অবস্থান। শুধু মানুষের জন্য নয়, তাঁর মৈত্রীভাব পৌঁছে গিয়েছিল দৃষ্টিগোচর হয় কিংবা দৃষ্টিগোচর হয় না এমন সকল প্রাণীদের কাছে। তাই তো তিনি বলেছিলেন, ‘সব্বে সত্ত্বা সুখিতা হোন্তু’ অর্থাৎ জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। বোধের অমৃত অবগাহন হলে প্রাজ্ঞদের সকলে স্বীকার করেন যে জাতপ্রথা, ধর্ম-র্বণ-গোত্র বিভাজন নিষ্ফল, নিরর্থক। বোধের বাতায়ন রুদ্ধ থাকার দরুন অন্ধ প্রকোষ্ঠে মানুষ মানুষের সাথে, ধর্ম ধর্মের সাথে, গোত্র গোত্রের সাথে, পিতা পুত্রের সাথে, পুত্র পিতার সাথে, ভাই ভাইয়ের সাথে, বন্ধু বন্ধুর সাথে নানান স্বার্থের বশে কলহরত। মহান বুদ্ধ বলেন, কলহে জর্জরিত অন্ধ মানুষ জানে না, সে নিজেই যেখানে নিজের নয়, অন্যকে অধীনে হাতের মুঠোতে বশ করতে চায় কী করে! বুদ্ধের শিক্ষা বা দেশনা পাঠোদ্ধার করলে দেখা যায়, জীব মাত্রেই স্বাধীন। পারিবারিক, সামাজক, রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয়ভাবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলেই স্বাধীন অংশগ্রহণ, স্বতন্ত্র জীবনযাপনের অধিকার রাখে। এখানে কোনো প্রকার বৈষম্য দেখা দিলে তা বুদ্ধ ধর্মের পরিপন্থি বলেই গণ্য হবে।
মানুষ হিসেবে আমাদের বাড়তি কিছু সুযোগ-সুবধিা রয়েছে...শুধু আত্মর্স্বাথ চরিতার্থ করাই নয়, অর্পিত দায়ত্বি সম্পাদেনর প্রতি সবিশেষ মনোযোগ, সৎ ও নিষ্ঠার সাথে পালনীয়। সর্বজীবের প্রতি মানবকি র্কতব্য পালেনর জন্য কারো নির্দেশের অপেক্ষায় থাকাটাও অনেক সময় অমানবিক। আমরা মানুষ হিসেবে মানুষের গরজে মঙ্গলকর কর্তব্য পালন করবো। এটা মা, মাটি ও মানুষের ধর্ম, এটা জগত ও জীবের প্রকৃতির সাথে সংগতিপূর্ণ ধর্ম। আমরা স্মরণ করতে পারি এ বিষয়ে তথাগত বলেছেন, মা যেভাবে সকল আপদ বিপদ থেকে নিজের সন্তানকে অপার মৈত্রীবন্ধনে বুকে জড়িয়ে রাখে, রক্ষা করে তোমরাও সেরূপ মৈত্রীভাব সকল জীবের প্রতি পোষণ করবে।
বাংলাদেশে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম অধ্যুষিত জনবহুল একটি দেশ। পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ আমাদের এই মাতৃভূমি। নাতিশীতোঞ্চ আবহাওয়ার কারণে আমাদের সামগ্রিক অবস্থায় বিশেষ প্রভাব রয়েছে ঐতিহাসিকভাবে। যদি দেখি বৌদ্ধরা কখনো ধর্মীয় উন্মাদনায় আস্থাশীল নয়, তারা জ্ঞানের বাহনে চড়ে জীবনযাপন করতে আগ্রহী।
এ দেশ চারশত বছর বৌদ্ধরা শাসন করে (পাল রাজাগণ), যাকে ঐতিহাসিকগণ বাংলার র্স্বণযুগ বলেই মত দেন। পালদের রাজত্বকালে সকল ধর্মের সহাবস্থান বাংলার যেকোনো সময়ের চেয়ে উচ্চস্থান করে নিয়ে আজো সোনার মতো উজ্জ্বল্য ছড়াচ্ছে। আমরা বুদ্ধের এ কথা কখনো ভুলি না যে, কর্ম সুফল ও কুফলদায়ী, যার যার কর্ম স্ব স্ব অবস্থানে ভোগ করতে হবে। জীব মাত্রেই কর্মের অধীন। এমতাবস্থায় আমরা বিশেষ ধর্মের বাণী অথবা ব্যক্তিগত মতামত জোর করে প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে কারো ওপর প্রতষ্ঠিা করতে পারি না। প্রত্যকেই নিজের মতো করে মত প্রকাশের স্বাধীনতা রাখে যা মতামতের ভিত্তিতে খণ্ডনও করা যায়। আমি যেরূপ আমার নিজের মতো মত প্রকাশ করতে পারি, করতে চাই, অন্যজনেরও ঠিক একইভাবে তার মতো করে মত প্রকাশ করার একান্ত স্বাধীনতা শতভাগ রয়েছে। জ্ঞানদৃষ্টি বা মানবকি দৃষ্টিকোণ, যেখান থেকেই বলি না কেন দেখা যায় যে, ধর্ম বা মতবাদ মানা না-মানা ব্যক্তির স্বতন্ত্র ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে । কিন্তু ভিন্ন ধর্ম, মত ও পথের মানুষের সহাবস্থান নিরাপদ, সুনিশ্চিত করতে হবে।
ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী ছাড়াও এই ছোট্ট দেশটিতে রয়েছে নানা দেবদবীতে বিশ্বাসী অসংখ্য ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জাতিগোষ্ঠী, যাদের প্রত্যকের রয়েছে আলাদা আলাদা কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ঐতহ্যি, ভাষা, ধর্মবিশ্বাস, জীবনাচরণ ইত্যাদি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি সংখ্যালঘু এসব সম্প্রদায় সেই প্রাচীনকাল থেকেই মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। মসজিদ, মন্দির, বিহার, র্গীজার পাশাপাশি নানা উপাসনালয় রয়েছে নানা ধর্মবিশ্বাসীদের। হিন্দু মন্দিরের শাখঁ কিংবা কাসর ঘণ্টার আওয়াজ যেমন কখনো অন্যান্য ধর্মের লোকের কানে বেসুরে ঠেকেনি, তদ্রূপ মুসলিমদের ইবাদত, বন্দেগী, আজানের ধ্বনিও ভিন্নমতালম্বীর কানে বিকট ঠেকেনি। বৌদ্ধদের বন্দনা-গীতি, খ্রীস্টানদের ভজনা ও র্প্রাথনা যে কাউকেই প্রীত করে । এসবের মাঝে যখন অপ্রত্যাশিতভাবেই ঐক্যতানে ছেঁদ পড়ে তখন আমরা বিপন্নবোধ করি।
আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত হবে না, এ দেশের মানুষের কাছে নানান ধর্ম ও মতবাদ আসার আগওে আমাদের পূর্বপুরুষরা ছিলো; আমরা তাদেরই উত্তরাধিকারী হয়ে ধর্ম ও মতের বিভক্তিতে রক্ত ও সংস্কৃতির বিচ্ছেদ করতে পারি না। এটা যথাযোগ্য অনুধাবন করতে না পারলে কোনো জাতি সে যতই সমৃদ্ধশালী হোক না কেন, সময়ের পরক্রিমায় তার ধ্বংস অনিবার্য। ভিন্নমত ও পথের বিচিত্র-বৈচিত্র্যপূর্ণ মানুষ পৃথিবীতে অতীতে ছিলো, বর্তমানে আছে ভবিষ্যতেও থাকবে, এটা স্বাভাবিকভাবে মেনেই সকলের সাথে ভ্রাতৃত্বের, বন্ধুর বন্ধনে আবদ্ধ হতে হবে, এমন গুণাবলীই মানুষের উত্তম ধর্ম।
সম্প্রীতি ও সৌর্হাদ্যর্পূণ পরিবেশে জীবনধারণ: ধর্মপদে বুদ্ধের উপদেশ উক্ত হয়েছে যে “কেউ সন্ত্রাসের মাধ্যমে কোনো বিরোধ মীমাংসা করলে সেটি অন্যায় হবে জ্ঞানীরা কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ সেটা গভীর ও শান্তভাবে বিবেচনা করে দেখেন। যিনি অহিংস উপায়ে সুন্দর পথে অন্যদেরকে পরচিালতি করেন তাকে সত্য, জ্ঞান ও ন্যায়ের অভিবাবক রূপে গণ্য করা যায়।’ (ধর্মপদ, ২৫৬-৫৭)
‘অতি মূল্যবান পোশাকে সজ্জিত না হয়েও যিনি শান্ত, সমাহিত, সৌম্য, সংযমী, আত্মনিয়ন্ত্রিত, পবিত্র জীবনাচারী, সুপ্রতিষ্ঠিত, অহিংস নীত-আদর্শে বিশ্বাসী, মৈত্রীময় জীবনযাপনে অভ্যস্ত ও সকল প্রাণীর প্রতি মৈত্রী-করুণাভাব পোষণকারী তিনিই প্রকৃতপক্ষে পূত-পবিত্র-ত্যাগী, তিনিই প্রকৃত ভিক্ষু, প্রকৃত সন্ন্যাসী।” (ধর্মপদ, ১৪২
একদিন এক ভিক্ষু বুদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন, “ভন্তে কার মধ্যে দিনেরাতে পুণ্য বৃদ্ধি পায়? কে ধার্মিক, কে পুণ্যবান বা পুণ্যবতী, কে র্স্বগে গমন করতে পারে? বুদ্ধ উত্তর দিলেন, “যে সকল লোক গাছ লাগায়, কুঞ্জবন তৈরি করে উদ্যান সৃষ্টি করে, সেতু নির্মাণ করে, পুকুর খনন করে, মানুষের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করে ইত্যাদি তাদের মধ্যে দিন দিন বিকশিত হয়। এসব ধার্মিক লোকেরা র্স্বগে যায়।” (বনরোপা সূত্র)
ঘৃণা, বিদ্বেষর্পূণ কথা, প্রতিহিংসা ও আত্ম-বিশ্লেষণের গুরুত্ব: ‘তারা আমাকে অপমান করছে; আমাকে আহত করেছে; আমাকে পরাজিত করেছে; তারা আমাকে প্রতারিত করেছে- যার চিন্তার মধ্যে এগুলো স্থান পেয়েছে তার মন থেকে কখনো বিদ্বেষভাব দূরীভূত হবে না, তার মনের ক্লেশ-দ্বেষ কখনো শেষ হবে না। তারা আমাকে অপমান করেছে; তারা আমাকে আঘাত করেছে; তারা আমাকে পরাজিত করেছে; তারা আমাকে প্রতারিত করেছে- এ ধরনের চিন্তা যারা মনে স্থান দেয় না তাদের মন থেকে হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা চিরতরে দূরীভূত হয়ে যাবে। হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণার দ্বারা কখনো ঘৃণা-বিদ্বেষ জয় করা যায় না। ঘৃণা-বিদ্বেষ উপশম হয় মৈত্রীর দ্বারা। এটাই শাশ্বত নিয়ম।’ (ধর্মপদ, ৩-৫)
‘অন্যকে দোষারোপ করে কটুবাক্য, অন্যকে অপমান করে বিদ্রুপাত্মক বা দম্ভাত্মক বাক্য র্বষণ— এ ধরনের আচরণে হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা উৎপন্ন হয়। এখান থেকেই দ্বন্দ্ব-সংঘাত উৎপন্ন হয়; এভাবেই মানুষের মনে বৈরী চিন্তা ও মনোভাব তৈরি হয়। (ধর্মপদ, ৮)‘অন্যের দোষ ধরো না, অন্যের ছিদ্র অন্বেষণ করো না, অন্যেরা কোনটা করেছে বা করেনি সেটা দেখো না, তুমি নিজে কোনটা করেছ বা করোনি সেটা বিচার করো।’ (ধর্মপদ, ৫০)
‘নিজেকে অন্যের চেয়ে বেশি ভালো কিংবা অন্যের চেয়ে বেশি হীন কিংবা অন্যের সমান, এ রকম কাউকে মনে করতে দিও না; অনেক মানুষের দ্বারা প্রশ্নের সম্মুখীন হয়ে কারো সামনে নিজেকে জাহির করতে দিও না।’ (সুত্ত নপিাত, ৯১৮) বুদ্ধ বলেছেন, ‘কোনো নির্দিষ্ট মতের প্রতি বেশি ঝুঁকে পড়া বা বেশি সংশ্লিষ্ট হওয়া এবং অন্যের মতকে হীন হিসেবে অবজ্ঞা করাকে জ্ঞানীরা মনের সংর্কীণতার বেড়াজালে আবদ্ধতা বলেন।’ (সুত্তনপিাত, ৭৯৮)
বুদ্ধের সঙ্গে একবার পরম বিত্তশালী ব্যক্তি উপালির সাক্ষাৎ হয়েছিল। উপালি ছিলেন অন্য ধর্মের অনুসারী। উপালি বুঝতে পারেন নি, বুদ্ধের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে তখন বুদ্ধ স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, অন্যান্য সকলের সঙ্গে যেভাবে ব্যবহার করেন তাঁর সঙ্গওে ঠিক একইভাবে ব্যবহার করবেন। সারা জীবন ধরে বুদ্ধ মানুষকে সকল ধর্মের মানুষের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা বলেছেন, তাদের মধ্যে মতের পার্থক্য থাকা সত্বেও।
লেখক পরিচিতি: ভিক্ষু সুনন্দ প্রিয়, সম্পাদক, সৌগত। (এটি ২০১৯ সালে অনাবরণ স্মরণীকায় প্রকাশিত)






