তখন জানুয়ারি মাস প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি। সবেমাত্র মহান আর্যপুরুষ পরম পূজ্য বনভান্তের ৯৯তম জাঁকালো শুভ জন্মদিন উদযাপন শেষ হলো দিনকয়েক আগে। সেই খুশির রেশ কিন্তু তখনো সবার চোখে-মুখে লেগে আছে। এমনই এক সুন্দর সকালে আমরা রাঙামাটি রাজবন বিহার থেকে যাত্রা শুরু করি। ২০১৮ সালের ১৪ই জানুয়ারির সুন্দর এক শীতের সকাল। আমাদের গন্তব্যস্থান ছিলো মারিশ্যার নলবনিয়া গ্রামের নালন্দা বনবিহার। তারপর আবার সেখান থেকে কিছুটা দূরে গিয়ে আর্যবন ভাবনা কুটিরই আমাদের শেষ গন্তব্য। সঙ্গে আমাদের ধর্মীয় ও পালি ভাষার শিক্ষক শ্রদ্ধেয় করুণাবংশ ভান্তে। আর আমরা যারা শিক্ষার্থী ছিলাম যথাক্রমে শ্রীমৎ দীপালোক ভিক্ষু, শ্রীমৎ শ্রদ্ধামিত্র ভিক্ষু, শ্রীমৎ শীলবন্ত ভিক্ষু, শ্রীমৎ মহাগুপ্ত ভিক্ষু, শ্রীমৎ সত্যলঙ্কার ভিক্ষু, শ্রীমৎ অগ্রকীর্তি ভিক্ষু, ও আমিসহ মোট সাতজন। আবার সেখান থেকে অর্থাৎ মারিশ্যার আর্যপুর ধর্মোজ্জ্বল বনবিহার থেকে দুজন- শ্রীমৎ শুভাঙ্কুর ভিক্ষু ও শ্রীমৎ সর্বানন্দ ভিক্ষু। সবাই মিলে আমাদের পালি শিক্ষা কোর্সে ছাত্র বলতে মোটে এ নয়জন।
শুরুতে সুদূর রাঙামাটি থেকে নলবনিয়া গ্রামে আসার নির্মল ও বৈচিত্রপূর্ণ অভিজ্ঞতাটুকু একটু শেয়ার করি। ঝগরাবিল, পেদা তিং তিং, সুবলং প্রভৃতি চোখ জুড়ানো মনকাড়া নদীর দুপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে দেখে টেম্পু বোটযোগে চলেছি সুদূরের পানে। যতদূর চোখ যায় কাপ্তাই লেকের পানি আর প্রকৃতির রানি রাঙামাটি জেলার উঁচু-নিচু পাহাড় বেষ্টিত অবারিত সবুজ বনভূমি। এভাবে প্রায় একটানা সারে ছয় ঘন্টা বোটজার্নি করে বিকেলবেলা এসে পৌঁছায় নির্ধারিত গন্তব্যস্থানে। এ অঞ্চলে আমার সেই প্রথম পা ফেলা। এর আগে নলবনিয়া কেন মারিশ্যা এলাকায়ও আসার সুযোগ হয়নি আমার। নালন্দা বন বিহারের সুযোগ্য অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় আনন্দ ভান্তে আমাদের উপর উপচেপড়া স্নেহের আশির্বাদের ঝুড়ি উপুড় করে ঢেলে দিলেন। আর উপাসক-উপাসিকারা শ্রদ্ধামেশানো স্নিগ্ধ অভিবাদন ও সাদরে উঞ্চ অভ্যর্থনা জানালেন আমাদের।
প্রথমে এতজন উপাসক-উপাসিকা দেখে মনেমনে খানিকটা বিস্ময়ের ঝাঁকি খেলাম আমি। কারণ অনুষ্ঠান-টনুষ্ঠান কিছুরই তো আয়োজন দেখছিনা, অথচ হুট করে দেশনাহলে বেশ চোখে পড়ার মতো যথেষ্ট সংখ্যক উপাসক-উপাসিকা জড়ো হয়েছেন। কেননা এর আগে আমি সাধারণত কোনো বিহারে গেলে সেবক কিংবা দু-একজন সাহায্যকারী ছাড়া সেই অপ্রস্তুত মুহুর্তে ভন্তেদের এভাবে সাগ্রহ ও আন্তরিক স্বাগত জানাতে খুব কমই দেখেছি (অবশ্য বড়ো বড়ো অনুষ্ঠান বাদে)। এখানে এসে দেখছি দৃশ্যপট পুরোপুরি ভিন্ন। তবে শিগগিরই আমার বিস্ময়ের ভাবটা কর্পূরের মতো উবে গেল। কেননা ধর্মীয় আচার-ব্যবহারে এ নলবনিয়া অঞ্চলের উপাসক-উপাসিকাদের কীর্তির সুভাষ অনেক আগেই বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে। তাই নতুন করে অবাক হওয়ার কিছুই নেই অন্তত আমার জন্য।
সে যা-ই হোক, চলুন এবার শিক্ষার দিকে একনজর ফিরে তাকানো যাক। প্রথমে আমি ধর্মীয় শিক্ষার আওতার বাইরে যে শিক্ষা সেদিকে একটু নজর দেব। সাধারণ অর্থে ‘শিক্ষা’ মানে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জন করা। তবে আরো একটু ব্যাপক অর্থে বুঝাতে গেলে শিক্ষার অর্থ দাঁড়ায়, পদ্ধতিগতভাবে জ্ঞান অর্জনের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে। কেননা শিক্ষার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির ভেতরকার সুপ্ত প্রতিভাগুলো জেগে ওঠে। মনের সুপ্ত সম্ভাবনাগুলো পাপড়ি মেলে ধরে, প্রস্ফুটিত হয়, বিকশিত হয়। যে দক্ষতার সাথে জ্ঞান অর্জন করে সে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান এ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে অন্যদের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে ঠিকে থাকতে গেলেও শিক্ষা ছাড়া অন্যকিছুর কথা ভাবাই যায় না। পেশাগত জীবনেও চতুর্থ শ্রেণির চাকরি থেকে শুরু করে প্রথম শ্রেণির চাকরি পর্যন্ত সবখানেই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা আবশ্যিক।
শিক্ষার গুরুত্ব মূল্যায়ন করতে গিয়ে বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস বলেছিলেন, “শিক্ষা হলো মিথ্যাকে ঝেড়ে ফেলে সত্যকে পরিপূর্ণ করে তোলা।” কবিগুরু রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলেছিলেন, "শিক্ষা হলো তা যা আমাদেরকে কেবল তথ্য পরিবেশন করে ক্ষান্ত হয় না, বিশ্বের মানবসত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকেও গড়ে তোলে।” সুতরাং এককথায় বলতে গেলে শিক্ষা হচ্ছে কোনো ব্যক্তির ভেতর বেঘোরে ঘুমিয়ে থাকা অমিত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা ও পরিপূর্ণরূপে বিকশিত করা।
যেহেতু প্রবন্ধটি পালি শিক্ষা কোর্সের উপর ভিত্তি করে লেখা সেহেতু আমি ধর্মীয় শিক্ষার প্রেক্ষিতটাই বেশি প্রাধান্য দেব। ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলে বর্তমানে আমাদের ধর্মচর্চা ও ধর্মশিক্ষার অবস্থা খুবই নাজুক। কেননা বাইরের চাকচিক্যময় রূপ দিয়ে এ দেশের প্রচলিত বৌদ্ধধর্মকে বিচার করলে কিছুতেই এটিকে খাঁটি বলে ধরে নেয়া যায় না। কি গৃহী কি ভিক্ষু, কারো পক্ষেই এমন বৌদ্ধধর্ম খুব একটা কল্যাণকর বলে মনে হয় না। বৌদ্ধ ধর্মবের এমন বেহাল দশার কারণ হিসেবে আমি দুটো কারণকে চিহ্নিত করব। প্রথমটি হচ্ছে ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি আমাদের উদাসীনতা অর্থাৎ পরিয়ত্তি শিক্ষাকে অবহেলা করা। যার ফলে আমাদের দৈনন্দিন ধর্মচর্চায় ভূল হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে প্রতিকূল বৈরি পরিবেশে বসবাস। কারণ যা-ই হোক না কেন, মোদ্দাকথা হচ্ছে ধর্মীয় পরিবেশ বজায় রাখতে হলে আমাদেরকে অবশ্যই প্রথমে ধর্মীয় শিক্ষা বা পরিয়ত্তি শিক্ষার দিকে গুরুত্ব দিতেই হবে। তা না হলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ধর্মচর্চাটা অন্ধকার কানাগলিতে ঘুরপাক খেতেই থাকবে। সেখান থেকে বের হতে পারবে না, লক্ষ্যে পৌছুতে পারবে না।
ভগবান বুদ্ধের প্রবর্তিত মহান বৌদ্ধধর্মকে টিকিয়ে রাখতে হলে সঠিক ধর্মশিক্ষা ও ধর্মচর্চার কোনো বিকল্প নেই। "বিনযস্স নাম সাসনস্স আযু" এটি বৌদ্ধ পালিঅট্ঠকথা সাহিত্যের একটি বিখ্যাত উক্তি। সঠিকভাবে বিনয়চর্চা করতে হলে আমাদের (বিশেষত ভিক্ষুদের) অবশ্যই প্রথমে পরিয়ত্তি শিক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। কেননা, যদি আমরা প্রথমে পরিয়ত্তি শিক্ষা না করি তাহলে সঠিকভাবে ধর্মবিনয় চর্চা করবো কিভাবে? বিনয়ের প্রতিটি বিষয় বা শিক্ষাপদের যে আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে, আলাদা আলাদা ব্যাখ্যা রয়েছে তা বুঝবো কেমন করে? আর শিক্ষাপদগুলোতে এমন কতগুলো নিখুঁত বিচার বিশ্লেষণ রয়েছে যেন সঠিক পরিয়ত্তি শিক্ষা ছাড়া সেগুলো আয়ত্ত করবো কীভাবে? কোনগুলো ঠিক কোনগুলো বেঠিক কিংবা উচিত অনুচিত চিনবো কীভাবে? বইয়ের মধ্যে সবকিছু লেখা থাকলেও কেউ আমরা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারবো না যে সবটাই বুঝি। তাই সমাধানের পথ হিসেবে পরিয়ত্তি শিক্ষার পরিবেশ গড়ে তোলা অতি অবশ্যই জরুরি।
আমি অনেক ভান্তেকে নির্দ্বিধায় বলতে শুনেছি যে বিনয়চর্চা আমার বেলায় অত ঝামেলার কিছু না, বিনয়ের ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে অতশত ভেবে আমি মাথায় তালগোল পাকায় না। যেভাবে চলছে সেভাবে চলতে পারলেই ভালো। অর্থাৎ গড়ে ওঠা কতগুলো প্রথাগত নিয়মের ঘোর বিশ্বাসী। এমন একখাপ্পা উদ্ভট কথা শুনলে শুধু পিলে তো নয়, রীতিমতো হৃদপিণ্ডও চমকে ওঠে। গৃহীদের কাছ থেকেও কোনো কোনো সময় এমন কথা শোনা যায় যে, ‘আরে! একটু-আধটু এদিক সেদিক তো হবেই, তাতে কী!’ দেখুন এসব কী আজব কথাবার্তা। মনে হয় যেন কাউকে সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। হ্যাঁ হ্যাঁ, বলবেই তো। এর মূল কারণ তো ধর্মীয় শিক্ষা বা পরিয়ত্তি শিক্ষার প্রচণ্ড রকম অভাব। আপাতদৃষ্টিতে এসব গড়ে ওঠা প্রথাকে নিয়ম বলে ধরে নেয়া হলেও একটু ভালোভাবে লক্ষ করলে বিনয় বা ত্রিপিটকের সাথে ঠিক যেন মেলে না। আমার তো মনে হয় বহু আগে থেকে চলে আসা প্রথাগত কিছু প্রচলিত নিয়মও সত্যি সত্যি বিনয় নামক গাছে পরগাছা গজিয়েছে, আর তা ক্রমাগত আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে যা গোটা ত্রিপিটকে হন্যে হয়ে গোরুখোঁজা খুঁজলেও আদৌ পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। তাই আমাদেরকে এসব জানতে ভিক্ষু-গৃহী উভয়কেই যার যার অবস্থান থেকে অবশ্যই ত্রিপিটক স্টাডি করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষার দিকে অগ্রসর হতে হবে।
বর্তমানে বাংলায় ত্রিপিটক প্রকাশিত হয়েছে। তাই আর বইয়ের কোন অভাব নেই। ত্রিপিটক শেখা, গবেষণা করা কিংবা উপলদ্ধি করার এ রকম ভালো সুযোগ আর কতটুকু লাগে। এখনই এ মূল্যবান সুযোগ গুরুত্ব সহকারে কাজে লাগানো যেতে পারে। তা না হলে পরে ধর্মীয় রীতিনীতি রাতারাতি অবনতির দিকে পা বাড়াবে, শেষ পর্যন্ত একদম শেষের তলানিতে গিয়ে ঠেকবে।
এমনিতেই ধর্মের পরিহানির কথা বারেবারে এসে যায়। ভগবান বুদ্ধও অনেক জায়গায় ধর্মের পরিহানির কথা উল্লেখ করেছেন কিভাবে তার ধর্ম ধীরেধীরে নীচে নেমে যাবে। থাক! আর পরিহানির কথা বাড়াতে যাব না। পরিহানির কথা শুনলে কেন যেন আমার মনে একধরনের অস্বস্তিকর অনুভুতি জাগে।
যা-ই হোক, বরাবরের মতো পরিয়ত্তি শিক্ষার দিকেই ফিরে তাকানো যাক। পরিয়ত্তি শিক্ষার ব্যাপারে অঙ্গুত্তর নিকায়ের প্রথম ধর্মবিহারী সূত্রে ভগবান বুদ্ধ তখনকার সময়ের জনৈক এক ভিক্ষুকে বলেছিলেন, “হে ভিক্ষু, কোনো ভিক্ষু সে পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে সুত্র শিক্ষা করে, গেয়্য বা আবৃতিযোগ্য গাথা শিক্ষা করে, ব্যাকরণ শিক্ষা করে, গাথা শিক্ষা করে, উদান শিক্ষা করে, ইতিবুত্তক শিক্ষা করে, জাতক শিক্ষা করে, অদ্ভুত ধর্ম ও বেদল্ল শিক্ষা করে অর্থাৎ এককথায় পরিয়ত্তি শিক্ষা করে। কিন্তু তাই বলে সে শুধু সেই পরিয়ত্তি ধর্মশিক্ষা করে দিন কাটিয়ে দেয় না। সে নির্জনতাকেও ভূলে যায়না। পারমার্থিক চিত্ত উৎপাদন করতে শমথভাবনায় নিরত হয়।"(অ.নি.৫.৭৩) কী সুন্দর উপদেশ না? এখানেও ভগবান বুদ্ধ প্রথমে ডিরেক্টলি পারমার্থিক জীবনের কথা বলেননি। আগে পরিয়ত্তি শিক্ষায় দক্ষতা অর্জন করে ধাপে ধাপে পারমার্থিক জীবনের দিকে অগ্রসর হতে উপদেশ দিয়েছেন। পরিয়ত্তি শিক্ষাকে অবলম্বন করে পারমার্থিক চর্চার দিকে ব্রতী হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
আবার একসময় ভগবান আনন্দ স্থবিরকে নব প্রব্রজ্জিতদের উদ্দেশ্যে ধর্মদেশনা দিতে বলেন। তখন আনন্দ স্থবির বলেছিলেন, “হে আবুসোগণ, তোমরা শীলবান হও, পাতিমোক্ষ আচরণে সংযমতা অবলম্বন করো। আচার-ব্যবহারে সুসম্পন্ন হও। বিন্দুমাত্র নিন্দনীয় আচরণেও লজ্জাশীল হয়ে অবস্থান করো। শিক্ষাপদগুলো গ্রহণ করে যথার্থরূপে চরিত্র গঠন করো।"(অ.নি.৫.১১৪) পাঠক নিশ্চই এখানেও না বোঝার কোনো অবকাশ নেই। ধর্মের অন্তর্হিত হওয়ার প্রসঙ্গে বুদ্ধ সূত্রগুলিতে যে কথাগুলি বলে গেছেন তাতে আমাদের সবার আগে পরিয়ত্তি শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে দেয়। পরিয়ত্তি শিক্ষার ভিট মজবুত করতে ইঙ্গিত করে। কেননা পরিয়ত্তি শিক্ষার মাধ্যমে ধর্মচর্চার প্রতিটা ধাপকে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর করা সম্ভব হয়ে ওঠে।
এ ব্যাপারে অঙ্গুত্তর নিকায়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় সদ্ধর্মসম্মোস সূত্র দুটি আমাদের ভালোভাবে জানতে বেশ সাহায্য করে। সেখান থেকে আমি কিছু বাড়তি অংশ কাটছাঁট করে সেগুলির বাংলা অনুবাদ করে এখানে জুড়ে দিলাম। অতএব পাঠক, এখন আপনার সম্পূর্ণ মনযোগ আরো দৃঢ়ভাবে এখানেই মানে নীচের ব্যাখ্যায় ঢেলে দিন। কারণ বুদ্ধের কথাগুলো পড়তে বেশ মধুর লাগে তো বটেই, সেই সঙ্গে প্রচণ্ড রকম বাস্তবসম্মতও।
সেখানে এভাবে বলা হয়েছে : “হে ভিক্ষুগণ, যখন ভিক্ষুরা পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে সুত্র শিক্ষা করে না, গেয়্য বা আবৃতিযোগ্য গাথা শিক্ষা করে না, ব্যাকরণ শিক্ষা করে না, গাথা শিক্ষা করে না, উদান শিক্ষা করে না, ইতিবুত্তক শিক্ষা করে না, জাতক শিক্ষা করে না, অদ্ভুত ধর্ম ও বেদল্ল শিক্ষা করে না অর্থাৎ পরিয়ত্তি শিক্ষা না করে অসংলগ্ন পদ-শব্দ হতে অসংলগ্ন সূত্রাদি শিক্ষা করে। এতে অসংলগ্ন পদ-শব্দে অর্থও অসংলগ্ন হয়, ভূল হয়। তখন এটিই সদ্ধর্মের ভ্রান্তি ও বিলুপ্তির প্রথম কারণ।
যখন তারা শ্রুত ও পরিয়ত্তি ধর্মকে অপরের নিকট যথার্থভাবে দেশনা করে না। শিষ্টাচারহীন কথাবার্তা বলে, বিনয়ে সমৃদ্ধ হয়না, অসহিষ্ণু হয় ও শিক্ষা গ্রহণে পারদর্শী হয়না। তখন এটিই সদ্ধর্মের ভ্রান্তি ও বিলুপ্তির দ্বিতীয় কারণ।
যখন তারা শ্রুত ও পরিয়ত্তি ধর্মকে অপরের নিকট যথার্থরূপে বলে না আর যে সকল ভিক্ষু বহুশ্রুত, স্মৃতিধর, ধর্মধর, বিনয়ধর, মাতিকাধর তারাও উপদেশসমূহ অপরের নিকট পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বলে না। যার ফলে তাদের মৃত্যুর পরে সূত্রগুলো ভিত্তিহীন ও অরক্ষিত হয়ে পড়ে। তখন এটিই সদ্ধর্মের ভ্রান্তি ও বিলুপ্তির তৃতীয় কারণ।
যখন তারা শ্রুত ও পরিয়ত্তি ধর্মকে যথার্থরূপে শিক্ষা করে না। প্রবীণ ভিক্ষুরা ভোগ বিলাসে রত হন, নীতিহীন হয়ে পড়েন, নীতি স্খলনে প্রস্তাব দেন ও একাকী বাসের নিয়ম পরিত্যাগ করেন। তারা না পাওয়া বিষয় পাওয়ার জন্য, অনায়ত্ত বিষয় আয়ত্তের জন্য, অনুপলদ্ধ বিষয় উপলব্ধির জন্য প্রচেষ্টা করেন না। তাদের পরবর্তী প্রজন্মও ভূলবশতঃ একই পথের অনুসারী হয়। তখন এটিই সদ্ধর্মের ভ্রান্তি ও বিলুপ্তির চতুর্থ কারণ।
যখন তারা শ্রুত ও পরিয়ত্তি ধর্মকে মনযোগ ও আগ্রহের সাথে চিন্তা করে না, বিচার-বিশ্লেষণ করে না ও মনযোগ দিয়ে সতর্কতার সহিত বিবেচনা করে না এবং সঙ্ঘের মাঝে বিভক্তি দেখা দেয়। এতে তারা একে অপরকে ছেড়ে চলে যায়। যার ফলে অপ্রসন্নরা প্রসন্ন হয় না। প্রসন্নদেরও কারো কারো মনে অপ্রসন্নতা উৎপন্ন হয়। তখন এটিই সদ্ধর্মের ভ্রান্তি ও বিলুপ্তির পঞ্চম কারণ (অ.নি.৫.১৫৫-১৫৬)।
দেখুন, এখানে বুদ্ধ পরিয়ত্তি শিক্ষাকে গুরুত্ব না দিলে কী কী হয় তার পরিণামগুলো নাড়িভুরিসহ দেখিয়ে দিয়েছেন। জানার প্রয়োজন মনে করে রেফারেন্স দিয়ে সবার সাথে শেয়ার করলাম। এ তো স্বয়ং বুদ্ধেরই কথা। যদি বুদ্ধের কথায় হৃদয় নাড়া দিয়ে না ওঠে তো করার আর কিছুই থাকে না। আমার তো মনে হয় এতেও বড্ড বেশি হয়ে গেল। তাই আর বেশি বেশি কথা বাড়িয়ে লম্বা করতে চাইনা। কেননা যথার্থ কাজ করে দেখাতে বেশি কথার প্রয়োজন পড়ে না।
এক ফাঁকে এবার একটু নিজের কথা বলে নিই, মানে পরিয়ত্তি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে আমার আনাড়ি মতামত কি বলে। আমরা (বনভন্তের ভক্তরা অর্থাৎ শিষ্য-প্রশিষ্য ও উপাসক-উপাসিকা) জানি যে বনভন্তের কতগুলো লালিত স্বপ্নের মধ্যে পালি কলেজ প্রতিষ্ঠা করা একটি অন্যতম স্বপ্ন। আর এও জানি যে ইতিমধ্যেই সেই লালিত স্বপ্নের পালি কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি যা অত্যন্ত গর্বের বিষয়। এক্ষেত্রে শুধু বনভন্তে শিষ্যদের কিংবা তার ভক্তদের গর্বের বিষয় নয়। বাংলাদেশের তথা সমগ্র বৌদ্ধ জাতীর গর্বের বিষয়ও বটে। কেননা যেখানে বুদ্ধের মুখনিঃসৃত বাণী শিক্ষা করা হয়, চর্চা করা হয়, আলোচনা করা হয় অথবা বুদ্ধের শিক্ষা ও আদর্শকে ধরে রাখার কোনো অবলম্বন হাতে নেয়া হয়, যা এককথায় পরিয়ত্তি-প্রতিপত্তি-প্রতিবেধ এ তিন প্রকার ধর্মকে শিক্ষা করা হয় সেই জায়গাটিকে ভিত্তি করে বহু বহু লোকের উপকার সাধিত হয়। ঠিক এমনি একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হচ্ছে ‘বনভন্তে পালি স্কুল এ্যন্ড কলেজ’। হুমম! খুবই ভালো কথা আর গর্ব করার মতো, না? কিন্তু...
এ কিন্তু'টাই বড়ো বিষয়। বড়ো ভাববার বিষয়, এমনকি বড়ো অবাক হওয়ারও বিষয়। তবে জানার বিষয়ও বটে! বললেও যে কাজ হবে তা অবশ্য মনে হয় না। যাক, তারপরও বলে ফেলি। মনের ভারটা অন্তত কিছুটা হলেও হালকা হবে। আগেই বলা হয়েছে যে আমরা পালি কলেজ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি। প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি সেটা ঠিক, কিন্তু এখনো ক্লাস চালু করতে পারিনি। ক্লাস চালু করার উদ্যোগ নিতে পারিনি। উদ্যোগ নেয়ার সামর্থ্য অর্জন করতে পারিনি। এমনকি এতদিনে সে-ব্যাপারে আমাদের মানসিকতাকে পর্যন্ত ততটুকু উন্নত করে তুলতে পারিনি। এখন নামে আছে কামে নাই এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে। যদিও এর আগে স্বল্প সময়ের জন্য হলেও দু'একটা পালি-অভিধর্ম কোর্স দেওয়া হয়েছে। সেই থেকে কোনো কোর্স-টোর্স ছাড়াই এখনো কোনো এক অদৃশ্য সুতোয় পেন্ডুলামের মতো ঝুলে আছে।
জানিনা কেন এভাবে ঝুলে রয়েছে। কোথাও কোনো গোলমাল নেই তো! শুনেছি পালি কলেজের শিক্ষক নিয়োগ করার জন্য নাকি শ্রীলঙ্কা, বার্মা থাইল্যান্ডের মতো বৌদ্ধপ্রতিরূপ দেশের বড়োবড়ো পণ্ডিত শিক্ষকের আশায় এখনো বসে আছে। তবে কতটুকু সত্যি সেটা খতিয়ে দেখার বিষয়। আমি বলি কি, এ মুসলিম প্রধান দেশে সে তো বামন হয়ে চাঁদের আশায় বসে থাকার মতো। কেননা এ দেশে বৌদ্ধদের অবস্থান একটি ঝিনুকের খোলসে কিছু বালির কণা তুলে রাখার মতো। বিদেশ থেকে ওভাবে শিক্ষক নিয়ে আসলে একটা চিন্তার বিষয়ও তো আছে, নয় কি? বর্তমানে এদেশের রাজনৈতিক অবস্থা তো আমরা কমবেশি সবাই জানি। তাহলে কীভাবে আশা করি? এ সব আকাশ কুসুম কল্পনা মাত্র। এখানে যারা শেখায় তাদেরকে নিয়ে শুরু করে দিলে তো হয়ে গেলো। এ ঝিনুকের খোলসে কোথায় পাবো সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মানো বাঘাবাঘা পণ্ডিতকে? এখানে যারা শেখায় তারা বার্মা, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার পণ্ডিতদের মতো না হলেও অনেক ভালো তো শেখায়। তাদের দিয়ে শুরু করে দিলে তো হয়ে গেলো। শিখতে শিখতে এমনও তো হতে পারে– “যদিও দেখ ছাই, উড়াইয়া দেখ ভাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন” অর্থাৎ এখান থেকেও তো জন্ম নিতে পারে ঐ দেশের মতো বাঘাবাঘা পণ্ডিত। আসলে আমাদের একটা জাতীয় বদঅভ্যাস আছে যে বাড়ির লোককে আমরা একটু কম পাত্তা দিই বা পাত্তাই দিতে চাই না। পূজ্য বনভন্তের ভাষায় ‘ফেদা কানুঙ্গো’ মনে করি আর কী।
মাঝেমাঝে ভাবি যে এমন যদি হয় তাহলে পালি শিখতে চায় যারা, বিনয় শিখতে চায় যারা, সুত্র ও অভিধর্ম শিখতে চায় যারা তাদের অবস্থা কী হবে? এসব শেখা তো প্রবজ্জ্যা নেয়ার পরেই একজন শ্রামণ বা ভিক্ষুর অবশ্য কর্তব্য। সে যদি এসব না শেখে অপরকে শিক্ষা দেয়া দূরে থাক, ভালোভাবে নিজেরটা সামাল দিতেও নাকাল হতে হবে। ভিক্ষু বা শ্রামণ যদি অক্ষর-জ্ঞানহীনও হয় তারপরও তাকে আচার্য-উপাধ্যায়ের নিকট যতটুকু ধারণ করা যায় শুনেশুনে হলেও শেখা দরকার। আমরা (বনভন্তের শিষ্যরা) তো অন্যান্য ভিক্ষুদের মতো যত্রতত্র জনতার ভীড়ে স্কুল-কলেজে গিয়ে শিখতে পারিনা। তাহলে শিখবো কীভাবে? পাবলিকের সঙ্গে (বিশেষ করে মেয়েদের সঙ্গে) যদি একবার ঠেলাঠেলি করে স্কুল-কলেজ যায়, তখন আর পায় কে! ফিরতে না ফিরতেই শুরু হয়ে যাবে অন্তর্ভেদী বাক্যের তীর ছোঁড়া। ফেইসবুকে প্রচন্ড ঝড় উঠবে, শুধু স্বাভাবিক ঝড় নয়, ঘন্টায় দু-তিনশো কিলোমিটার বেগে ছুটা সাইক্লোন-ঘুর্ণিঝড় বয়ে যাওয়াও অসম্ভব নয়। বলবে, গেলো রে! গেলো রে! একদম সব গেলো! বনভন্তের আদর্শ সব গেলো! দেখো তোমরা! দেখো! ঐ দেখো! নিন্দুকদের কথা তো বলার অপেক্ষা রাখেনা।
যাক, লিখতে লিখতে আমার একটি সত্যঘটনা মনে পড়ে গেলো। তখন আমি কলেজে পড়ি। বাসে কিংবা সিএনজিতে করে আমাকে প্রায় কলেজে যেতে হতো। একই বাসে যখন দেখি রংকাপড় পড়া বুদ্ধের প্রিয় পুত্রটি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাসের হাটল ধরে রংকাপড় এলোমেলো অবস্থায় মেয়েদের সাথে দলাদলি, ঘেষাঘেষি কিংবা ঠেলাঠেলি করে কলেজে যাচ্ছে। চলন্ত বাসের ঝাকুনিতে মাঝেমাঝে মেয়েদের দেহের কোনো অংশ বুদ্ধপুত্রটির বুকে-গায়ে গিয়ে ঠেকছে। বাতাসের তোড়ে মেয়েটির আগোছালো চুলও কখনো কখনো বুদ্ধপুত্রটির মুখ ঢেকে দিচ্ছে (কি জানি হয়তো-বা সুবোধ বুদ্ধপুত্রটিও প্রাণভরে মেয়েটির চুলের সুভাষ নিচ্ছে)। তখন সত্যি সত্যি আমি সেদিকে তাকাতে পারতাম না। কারণ গৃহী অবস্থায় থাকাকালীনও আমি ধর্মীয় বইটই পড়তাম বলে এসব ব্যাপারে খুবই স্পর্শকাতর ছিলাম। ধর্মবিনয় পরিপন্থী কোনো ঘটনা বা আচরণ দেখলে হুটকরে বইয়ে পড়ে যাওয়া বুদ্ধের সেই কথাগুলো মনে পড়ে যেতো। বুদ্ধের কথার সঙ্গে সেই বুদ্ধপুত্রদের বিরাট পার্থক্য দেখতাম। আর তখন আমি পূজ্য বনভন্তের কথাগুলোও খুবি মনদিয়ে শুনতাম। তার কথার সঙ্গেও সেই বুদ্ধপুত্রদের মিল খুঁজে পেতাম না। এখন এতে বছর পরে সেই মুহুর্ত্বগুলো বিচার করলে খুঁজে পায় অবশ্যই সেগুলো যথাযথ পরিয়ত্তি শিক্ষার অভাবেই হতো। কিন্তু কি আর করা! চোখ যেহেতু আছে দেখতে নাম চাইলেও উপায় তো নেই, কাজেই দেখে যেতেই হবে।
একটু বেশি বলে ফেললাম মনে হয়। ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়ার মতো হলো আর কি। যে কথাটির প্রসঙ্গে বলছিলাম মানে পরিয়ত্তি শিক্ষার উপর ভিত্তি করে। পাঠক আপনিও ভেবে দেখুন, স্বভাবতই অনেকে মুক্তির খোঁজে প্রবজ্জ্যা নেয় অথবা ধর্মের কোনো একটা দিক এগিয়ে নিতে। তাহলে কেন ভিক্ষুরা থাকার আগ্রহ নিয়ে প্রবজ্জ্যা নিলেও তাড়াতাড়ি কাপড় ছেড়ে চলে যায়? কেন তারা নিজেকে গড়ে তোলার মতো ধর্মীয় পরিবেশ খুঁজে পায়না অথবা নিজেকে নিজে গড়ে তুলতে পারেনা? নাকি আসলেই সেরকম পরিবেশে তাকে গড়ে তোলা হয়না? আবার কেন আমাদের এখানে পণ্ডিত ধর্মদেশক নেই? কেন ভাবনার বা ধ্যান-সমাধির উপর দক্ষ ভাবনাচার্য নেই? কেন আজ ধর্মের দোহাই দিয়ে কেউ কেউ নিজের মনগড়া আবোলতাবোল কতো কী বকে যাচ্ছে? উত্তর খুঁজে বের করা বড়ই কঠিন। তারপরও কিন্তু একেবারেই যে কিছুই আঁচ করতে পারা যায়না তার তো নয়। মূলে রয়েছে ধর্মের প্রতি যথেষ্ট গারবতা না থাকা আর ধর্মশিক্ষার প্রতি প্রচণ্ড রকম উদাসীনতা।
প্রতিটি ব্যক্তির নিজস্ব একটা স্বপ্ন থাকে। ভিক্ষুদের বেলায়ও তা মোটেই ভিন্ন কিছু নয়। কারণ তারাও তো মানুষ, এর থেকে বেশি কিছু তো নয়। যদি কেউ স্বপ্নহীনও হয় তখন তাকে শিক্ষার মাধ্যমেই তো স্বপ্ন বুনে দেয়া হয়। তাহলেই সে একটাকিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখে। ধরুন, কোনো ভিক্ষু একজন বিখ্যাত ধর্মদেশক হতে চায় বা ভাবনাচার্য হতে চায় অথবা দক্ষ একজন পরিয়ত্তি শিক্ষক হতে চায়। তখন তাকে সেই পরিবেশের সুযোগ করে না দিলে সে কি এমনটা হতে পারবে? গৃহী থেকে যখন কেউ প্রবজ্জ্যা নেয় ধর্মীয় বৃত্তের মাঝে সে তখন নতুন ও সবার কনিষ্ঠ সদস্য হয়। সবাইকে মান্য করে চলা তখন তার রীতিমতো কর্তব্য হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে যদি কনিষ্ঠ বলে তার স্বপ্নগুলো কোনো কারণে ভেঙ্গে যায় পারবে কি বুদ্ধশাসনে কোনো অবদান রাখতে? ত্রিপিটক বা পরিয়ত্তি শিক্ষা না করে সে কি ধর্মদেশক, ভাবনাচার্য কিংবা ধর্মীয় শিক্ষক হতে পারবে? আমি বলি নিশ্চয়ই পারবে। তবে প্রকৃত ধর্মদেশক নয় হাবাগোবা দেশক হতে পারবে। ওলোজোলো সাধক হতে পারবে। হযবরল ভাবনাচার্য হতে পারবে। তার চাইতে বেশি কিছু নয়।
অতএব এসব থেকে যেকোনো একটি হতে গেলে প্রথমে তাকে শিখে নিতে হবে, আয়ত্ত করে নিতে হবে। হয়তো কেউ কেউ যুক্তি দাঁড় করাবে যে শাস্ত্রশিক্ষা না করেও মুক্তির আস্বাদ পাওয়া সম্ভব। আমিও তা অস্বীকার করছি না। তবে বর্তমানে এরকম ভাগ্যবান হাজারে বা লাখে একটা। যেমন উদাহরণ হিসেবে বলা যায় আমাদের সবার চেনা-পরিচিত ও শ্রদ্ধার আধার পরম পূজ্য বনভন্তে। তিনি শাস্ত্র বা পরিয়ত্তি শিক্ষায় আহামরি সুদক্ষ ছিলেন না। মূলত পরিয়ত্তি শিক্ষার সুযোগই তিনি পাননি। তারপরও তার মতো বিনয়সম্মত জীবনযাপন ও বুদ্ধের শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ জীবনাচার গড়ে তোলা বাংলাদেশে অন্য কেউ পেরেছে বলে বুকের পাটা উঁচিয়ে দাবী করতে পারবে বলে অন্তত আমার মনে হয় না। আর তখনকার সময়ে ধর্মের কোনো যুক্তিতে কেউ পূজ্য ভন্তের সঙ্গে পেরে উঠেছে বলে তো আমি এখনও শুনিনি।
উদাহরণ হিসেবে আরও বলা যায় সুনলুন সেয়াদ সহ বার্মার কোনো কোনো সেয়াদের কথা। থাইল্যান্ডের আজান চাহ্ ভন্তেসহ আরো অনেক বিখ্যাত ভন্তের কথা। তবে ওসব উজ্জ্বল উদাহরণ বর্তমানে খুবই কম। যারা ছিলেন তারাও অনেক আগের। সুতরাং এখন নিশ্চই বুঝতে আর বাকী নেই যে পরিয়ত্তি শিক্ষা কতটুকু জরুরি। পরিয়ত্তি শিক্ষায় শিক্ষিত কোনো ভিক্ষু, কোনো উপাসক বা উপাসিকা সে যদি বুদ্ধের আদর্শগুলো যথাযথ মান্য করে চলেন তখন ধর্মদেশক হোন বা সাধক হোন কিংবা শিক্ষক হোন আন্দাজে হাবিজাবি কিছুই বলবেন না, করবেনও না।
সেজন্যই বলি, যদি আমরা সবাই মিলে পালি কলেজটিকে নিয়ে একটু ভাবি, নজর দিই তাহলে পরিয়ত্তি শিক্ষা করার দ্বার খুলে যাবে। সেক্ষেত্রে ভিক্ষু সংঘ যদি সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করে আর উপাসক-উপাসিকারাও যদি সহযোগিতার উদার হাত বাড়িয়ে দেয় অবশ্যই কলেজটি চালু করা যেতে পারে। তাই এ প্রসঙ্গটির সম্পর্কে একদম শেষে বলবো যে, কোনো আদেশ-নির্দ্দেশ-উপদেশ কিছুই দেওয়ার অধিকার না থাকলেও অন্তত লিখে যাওয়ার খানিকটা অধিকার আছে বলে তো আশা করতে পারি। এ বিশ্বাস থেকেই মূলত এত এত কথার ফুলঝুরি। ছোটো মুখে বড় কথা হয়ে গেলে অভাজন আমাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখার সনির্বন্ধ প্রার্থনা রইল সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি।
এখন আসি শিক্ষা গেল বছরের পালি শিক্ষা কোর্সে কেটে যাওয়া বা অধ্যয়ন করে কাটিয়ে দেয়া আলোকিত দিনগুলির দিকে। হ্যাঁ, সত্যি সত্যি পালি শিক্ষা কোর্সে কাটিয়ে দেয়া দিনগুলি আসলেই মনে থাকার মতো। সপ্তাহে আমাদের ছয় দিন ক্লাস করতে হতো। বাকী একদিন অর্থাৎ শুক্রবার দিনের বেলায় দীর্ঘ নিকায়ের একটি বা দুটি করে সুত্র পড়ে নিয়ে সান্ধ্য সূত্রপাঠের পরে ধর্মালোচনা শুরু হতো, আর চলতো রাত নটা-দশটা পর্যন্ত। ক্লাস ও ধর্মীয় বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে বাংলা সাহিত্যের বইও পড়ে যেতে হতো। এখন ভাবতেই অবাক লাগে, সেই একটানা বই পড়ার স্রোতে আমি প্রথম দু’মাসে কখন যে পঁচানব্বইটি বই পড়ে ফেলেছি টেরই পাইনি। তবে ক্লাসের পড়া অনুসারে পরে বইপড়ার গতি খানিকটা কমিয়ে দিতে হয়েছে।
যাক, প্রথমে আমি পালি ভাষা শেখার মজার ঘটনাগুলো শেয়ার করবো। নিজেকে দিয়েই শুরু করি। প্রথম প্রথম আমি খুবই উৎসাহ ও আগ্রহের সাথে পালি শেখা আরাম্ভ করি। একদম শুরুর দিকে ফার্স্ট পার্টে ক্লাসের পড়াগুলো মনে হতো খুবই সোজা। ভাবতাম, দুনিয়াতে বোধহয় সবচেয়ে সহজ ভাষাটিই হচ্ছে পালি ভাষা। এতই সোজা মনে হতো যে পড়তে পড়তে একদম ছোটবেলায় তখনকার শিশু শ্রেণীর পাঠ্যবই ‘আদি বাল্য শিক্ষা’য় চলে যেতাম। মনে মনে একটু হাসিও পেত। কেননা এতদিন পরে এ বয়সে আমার পড়া বাচ্চাদের মতো সেই শুরু, অর্থাৎ অ আ ই ঈ উ ঊ। তারপর?
তারপর তো শুরু হলো আসল মজার খেলা! যখন শব্দ বাড়তে লাগলো বাক্য বাড়তে লাগলো আর অধ্যায় বাড়তে লাগলো। আনাড়ি মগজ দিয়ে বেজায় সমস্যায় পড়ে গেলাম। রাতে অনুশীলনীগুলো যখন অনুবাদ করতে যেতাম তখন একদম মাথা গরম হয়ে যেতো। মনে হতো যেন এইবুঝি মাথার তালুতে আগুন লেগেছে। তখনই সঙ্গে সঙ্গে আগের মত থেকে সরে এসে বলতে হতো দুনিয়াতে বোধহয় সবচেয়ে কঠিন ভাষাটিই হচ্ছে পালি ভাষা। হ্যাঁ, সত্যি কঠিন মনে হতো। যদি বাচ্চা ছেলে হতাম তো ততক্ষণে চোখের পানি নাকের পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতো। ভাগ্যিস একটু বড়ো হয়েছি। কোথায় যেনো পড়েছি বড়ো বড়ো ধ্বনিতাত্ত্বিকেরা বলে গেছেন যে, কোনো ভাষা যদি তাড়াতাড়ি আর ঠিকমতো শিখতে চাও তবে চটপট ঐ ভাষার কোনো মেয়ের প্রেমে পড়ে যাও। হায়! হায়! বলে কী তাত্ত্বিকেরা? তাইলে তো খাইছে আমারে! আমি তো একজন ভিক্ষু। ভিক্ষুরা তো কোনো মেয়ের প্রেমে পড়তে পারে না। প্রেমে পড়া তো দূরের কথা। প্রেমের নামে কোনো অফার-টফার পর্যন্ত দিতে পারে না। এমনকি ওরকম কোনো আকার ইঙ্গিতও মেয়েটিকে দেখাতে পারে না। আর যদি মেয়ের সঙ্গে কোনোভাবে লটরপটর হয়ে যায়, তো রংকাপড় খুলে গামছা একটা পরিয়ে দিয়ে সোজা বাড়ি। সেদিকেও জব্বর ভয়। আবার যার মাতৃভাষা পালি এমন কোনো মেয়ে তাবৎ দুনিয়াদারিতে এখনও বেঁচে আছে বলে তো মনে হয় না যার প্রেমে পড়া যায়। বুদ্ধের আমলে যদি হতো তাও একটা ছিল। ধুর ছাই! আসলে কপালটাই খারাপ। এ গোবেচারার তাই ভাষা শেখার জন্য আর প্রেমে পড়া হয় না। বাছাধনের মতো আবার দুধ খাও অবস্থা, অর্থাৎ আগের মতোই আদাজল খেয়ে লেগে পড়ো। কী আর করা! শুধুশুধু ব্রহ্মতালু গরম না করে মাথা ঠান্ডা করে শিখতে হতো আর কী।
পরদিন ক্লাসে গেলে ঘটতো আরেক মজার ঘটনা। কেননা বাড়িকাজ করে নিয়ে যেতে হতো প্রতিদিন। যদিও মাঝেমাঝে ঘটতো এগুলিতে অর্থাৎ বাড়িকাজ খাতাগুলিতে। খাতাগুলি যখন চেক করার পর ভান্তের কাছ থেকে ফেরত আসতো তখন মনে মনে যথারীতি টেম্পারেচার বেড়ে যেতো। ভেতরে ভেতরে মিটারে আর জায়গা কুলাতোনা। কারণ বাড়িকাজ খাতার খোলা ময়দানে করুণাবংশ ভন্তে লাল কলমের ক্রসফায়ারে খাতার বুক একেবারে ঝাঝড়া করে দিতেন। অর্থাৎ আমাদের বাড়িকাজগুলির অনুবাদে ভূল ধরা পড়তো বেশ। মনে মনে তখন নিজেকে বড়ই অসহায় মনে হতো। বলতে গেলে একদম খাটি বাংলায় যাকে বলে কোরবানি গরুর মতো অসহায় অবস্থা। কেননা আমার কষ্টের কথা কাছের স্যার যদি না বোঝেন তো বুঝবেটা কে? রাতে এত চুলচেরা বিচার বিশ্লেষণ করে, এত মগজ ধোলাই করে বাড়িকাজগুলো করলাম, অথচ ভান্তে কী নিষ্ঠুর করেই না কেটে দিলেন! তাহলে কি ভন্তে আসলেই নিষ্ঠুরের সুপারলেটিভ সেরা নিষ্ঠুর! না, যা ভাবতাম আসলে তা না। কেন? কারণ এরপর ভন্তে আমাদের ভূল করা বিষয়গুলি নিয়ে হাসি হাসি মুখ করে আলোচনা করতেন। কেন ভূল হলো সেই খুঁতগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দিতেন। উদাহরণের পর উদাহরণ দিয়ে যেখানে যেখানে ভূল হয়েছে খুঁটিয়ে দেখে এমনভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে শুনতে শুনতে সেই টেম্পারেচার নিমিষেই কোথায় যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যেতো। আমাদের সবার ভূল ভেঙ্গে যেতো। পাঠক, বুঝুন তাহলে অবস্থা। কী বাচ্চাছেলের মতো মনে করতাম, তাই না?
আসলে ক্লাসগুলি ছিল বড়ই মজার ও শিক্ষণীয়। একজন অভিজ্ঞ শিক্ষক যেভাবে তার ছাত্রদের দূর্বল দিকগুলি খুঁজে খুঁজে বেরকরে এনে যথাযথ শিক্ষা দিয়ে থাকেন, করুণাবংশ ভান্তেও ঠিক সেভাবেই আমাদেরকে শিক্ষা দিতেন। সেজন্য যতো দিন গড়িয়ে যেতে থাকে ততই তার শিক্ষাপদ্ধতিও নানা ধরনের হতে থাকে। ক্লাসে তিনি আমাদেরকে নিশ্চয়ই গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন করতেন। কেননা তিনি আমাদের জন্য নতুন যে পদ্ধতি হাতে নিতেন তাতে আমরা যারপরনাই উপকৃত হতাম। একেবারে অবাক হয়ে যেতে হতো কীভাবে তিনি আমাদের দূর্বল পয়েন্টগুলি জেনে ফেলেন! প্রায়ই সে অনুসারে শিক্ষাপদ্ধতি বের করে আমাদেরকে তাক লাগিয়ে দিতেন। শেখানোর বিষয়ে তিনি আমাদের কোনো কিছুই কার্পণ্য করতেন না, অর্থাৎ আচার্যমুষ্টি রাখতেন না। তিনি যা জানতেন, বুঝতেন ও উপলব্ধি করতেন সবকিছুই নিঃস্বার্থে বিলিয়ে দিতেন। যদিও তিনি কখনো নিজেকে আহামরি কোনো পণ্ডিত বলে দাবী করতেন না বা মনে করতেন না, তারপরও তার শেখানো কিংবা বুঝিয়ে দেয়ার স্টাইল ও ব্যবহৃত ভাষাশৈলীতে যথেষ্ট পাণ্ডিত্যের ছাপ ফুটে উঠত। আমি অনেকের কাছে শুনেছি, তিনি তার জ্ঞানের পরিধি অনুসারে নাকি বেশ পণ্ডিতের মতো। আমিও বলি একদম ঠিক কথা (তবে সরাসরি চোখেমুখে তাকিয়ে নয়, চুপিচুপি বলি আর কী!)
মাঝেমাঝে তিনি তার জীবনের গল্পও আমাদের সাথে বন্ধুর মতো শেয়ার করতেন। হ্যাঁ, আসলেই তো তাই। একজন জ্ঞানী শিক্ষক তিনি শুধু শিক্ষকের ভেতর সীমাবদ্ধ থাকেন না। ছাত্রদের একজন ভালো বন্ধুও হন। মনীষীরা সেজন্যই তো বলে গেছেন, যে শিক্ষক তার ছাত্রদের মনের খবর যদি কখনো নাই জানলেন তার শিক্ষকতা আসলেই বৃথা।
তিনি তার জীবনে কিভাবে বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে বহু চড়াইউৎরাই পেরিয়ে বর্তমান অবস্থানে উঠে এসেছেন সে কথা আমদেরকে শোনাতেন বেশ আবেগ দিয়ে। শুনতে বড়ই অবাক লাগতো আমাদের। জীবনের যে একটা আসলেই মানে আছে তা তার ফেলে আসা বাস্তব জীবনকাহিনীর মধ্যে জীবন্ত হয়ে ফুটে উঠতো। ভন্তের উৎসাহ, উদ্দীপনা ও প্রেরণাদায়ক কথাগুলো শুনে সত্যি মনের ভেতর রেখাপাত করতো ভীষণভাবে। সারাটা ক্লাস তিনি প্রায়শই প্রাণবন্ত রাখতেন আর আমাদের অনুৎসাহিত দেখলে মজার মজার বিষয় উপস্থাপন করে ধোঁয়া ওঠা তাজা চায়ের মতো স্বাদে ও উষ্ণতায় মনকে বিলকুল ফুরফুরে সতেজ করে তুলতেন।
এবার একটু ধর্মালোচনার দিকে মোড় ঘোরানো যাক। প্রতি শুক্রবার আমরা সপ্তাহের ধর্মালোচনায় সকলে মিলেমিশে একত্র হতাম। আর এ শুক্রবারটিই আমাদের একমাত্র ছুটির দিন। ছুটির দিন হলেও কোনোকিছু না করে যে কাটিয়ে দিতাম তা নয়। সারাদিন বই পড়াপড়িতে কেটে যেতো। শিক্ষক-ছাত্র কেউই অযথা সময় অপচয় করতাম না। আগেই বলেছি সন্ধ্যার পর পরই অর্থাৎ বিহারে সুত্রপাঠ শেষে ধর্মালোচনা শুরু হতো। এ ধর্মালোচনার মধ্যদিয়ে যে কতোটা উপকৃত হয়েছি তা বলে শেষ করা যাবেনা। এর আগে এ রকম কোনো ধর্মালোচনায় অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য অভাগা আমার কপালে জোটেনি। হয়ত তেমন ধর্মালোচনা হয়ও না। শ্রামণ থাকতে তো নয়ই, এমনকি ভিক্ষু হয়েও একদম না। চাকমা বাগধারায় যাকে বলে "উই কধা"।
তবে এবার করুণাবংশ ভান্তের সান্নিধ্যে থেকে ধর্মালোচনায় অংশগ্রহণ করার সৌভাগ্য হয়েছে। তাই সে পূণ্যময় মুহুর্তগুলো আপনাদের সাথেও অল্পস্বল্প শেয়ার করতে চাই। প্রথমে আমরা চারিদিকে গাছগাছালিতে ভরা(এটি আনন্দ ভন্তের যত্ন করে গড়ে তোলা বাগান। খুবি সুন্দর যা আপনার মনকেও কেড়ে নেবে আশা করি। এখানে এসে দেখার আমন্ত্রণ রইল সবার প্রতি।) কুটিরের প্রশস্ত উঠোনে বড়ো একটি চিরসবুজ গাছের নীচে ধর্মআলোচনা শুরু করতাম। ত্রিপিটকে উল্লেখ আছে, তখনকার সময়ে ভিক্ষুরা রাতে গাছের নীচে জড়ো হয়ে গভীর রাত পর্যন্ত ধর্মালোচনা করতেন। মনে হতো আমরাও তাদেরকেই অনুসরণ করছি। একই সুত্রের ওপর আমরা যারযার বক্তব্য নির্ধারিত সময়ে শেষ করে ফেলতাম। অতবেশি না পারলেও কিছু একটা বলতে হতো আর কী (হ্যাঁ, এর ফাঁকে জানিয়ে রাখি, কারোর হাত থেকে রেহাই পাওয়া গেলেও করুণাবংশ ভন্তের হাত থেকে রেহাই পাওয়া বড্ড কঠিন, পাঠক আপনাকেও একটু আভাস দিয়ে রাখলাম)। প্রথম প্রথম দু'একজন বাদে জড়তায় প্রায় সবার হাঁটু ঢোল-তবলা বাজার মতো যোগাড় হতো। অটোমেটিক্যালি ভাইব্রেশান, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া ও পেট মোচড় দিয়ে ওঠা তো একদম আগেআগে বোনাস পয়েন্ট হিসেবে কাজ করতো, যা এককথায়.... থাক! থাক! কিছু কিছু কথা না বলাই ভালো। সবার শেষে করুণাবংশ ভন্তে বলতেন। তিনি সুত্রের মূল পালি হতে অর্থকথা ও টীকা ঘেটেঘুঁটে সুত্রটির নাড়িভুঁড়ি সহ সব বেরকরে এনে আমাদের বুঝিয়ে দিতেন। এভাবে বেশকিছু ধর্মালোচনা করে যাওয়ার পর প্রায় সবাই আস্তে আস্তে ডেভেলপ করতে শুরু করলো। সবাই আস্তে আস্তে আত্মবিশ্বাস খুঁজে পেলো। সব মিলিয়ে ধর্মালোচনার অংশটিও বেশ জমে ওঠার মতো।
হ্যাঁ এভাবেই কেটে যেতো আমাদের পালি শিক্ষা কোর্সের প্রতিটি দিন, প্রতিটি সপ্তাহ ও প্রতিটি মাস। পাঠক আপনার হয়তো মনে হতে পারে, আমার লেখায় আমি রসের হাঁড়ি পেতে বসেছি। তবে আমি মজা করার জন্য কিংবা হাসানোর জন্য লিখিনি। শুধু এটুকুই বোঝাতে চেয়েছি যে ছোট্ট একটি শিক্ষা কোর্সের মাধ্যমেও কীভাবে একজনের জীবনকে আমূল বদলে দেয়া যায়। যাকগে, আসলে এ পালি শিক্ষা কোর্সকে ঘিরে ও পরিয়ত্তি শিক্ষার প্রয়োজনীতার প্রসঙ্গে আমার অনেককিছু লিখার ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু প্রবন্ধের এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে সবকিছু লিখা মোটেও সম্ভব নয়। আশাকরি কোনো একসময় অবশ্যই লিখবো।
সবশেষে কৃতজ্ঞতা জানানোর পালা। যেহেতু শিক্ষা কোর্সটিকে অন্তত একটু হলেও স্মৃতির ফ্রেমে বাঁধতে চেষ্টা করছি সেহেতু খুব স্বাভাবিকভাবে কোর্সটির শেকড়-বাকড়ও কিছু-না-কিছু অবশ্যই চলে আসবে। আমার মনে হয়ে আসা উচিতও। সুতরাং এ শিক্ষা কোর্সটিকে কেন্দ্র করে কৃতজ্ঞতার ঢালি নিয়ে সবার আগে যার দিকে এগিয়ে যাই আর যার পায়ে নিবেদন করি তিনি হচ্ছেন পরম হিতাকাঙ্খী ও পরম পূজনীয় ব্যক্তি পূজ্য বনভন্তে। কারণ তিনি হাতে ধরে কিংবা আদর করে না শেখালেও এদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে তিনিই প্রথম পালি ভাষা শিক্ষার মূল প্রেরণার উৎস। এরপর কৃতজ্ঞতার পুষ্পার্ঘ্য অর্পন করি সেই অতুলনীয় মহান কল্যাণকামী শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞাবংশ ভন্তের রাতুল চরণে। কেননা প্রথমে যার হাত ধরে এদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে পালি ভাষা শিক্ষার চল একটু একটু করে প্রজন্ম ধরে আজ এতদূর পর্যন্ত আসতে পেরেছে তা মূলত শ্রদ্ধেয় প্রজ্ঞাবংশ ভন্তের আন্তরিক পরিশ্রমেরই ফসল (যদিও আমার প্রব্রজিত জীবনে এ দুজন মহান ও গুণী ব্যক্তিকে একদম কাছ থেকে দেখার কখনও সৌভাগ্য হয়নি।) সুতরাং এ দু'জন মহান ব্যক্তিই পালি ভাষা শেখার ক্ষেত্রে সবার আগে গুরুর শ্রেষ্ঠ আসনে পূজা ও শ্রদ্ধার যোগ্য।
মূলত আমাদের এ পালি ভাষা শেখার প্রথম ও মূল উদ্যোগতা বিমল জ্যোতি ভিক্ষু (বর্তমানে গৃহী)। শ্রদ্ধেয় করুণাবংশ ভান্তের সম্মতিতে আর তার ডাকাডাকিতেই মূলত সত্যি সত্যি পালি শিক্ষা কোর্সটি হাতে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় যেদিন কোর্সটির উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করি ঠিক তার কিছুক্ষণ পরেই এ ব্রহ্মচর্যের সাজানো বাগান থেকে দেখতে দেখতে ফুলের মতো টুস করে ঝরে গেল আমাদের সবার প্রিয় বিমল জ্যোতি ভিক্ষু। তার মায়ের কঠিন অসুখের কারণে এভাবে হঠাৎ করে চলে যেতে হলো তাকে। বেচারা সেদিন আমাদের (বন্ধুদের) কতোই না ছলছল চোখে বিদায় জানিয়েছিল। যাক, তারপরও আমি তাকে কৃতজ্ঞতা নামের মহান উপহারটি রেখে দিয়েছি, ভূলে যাইনি, ভূলে যাবোও না কখনো। তাই আজ শিক্ষার শেষে কোর্সটির প্রধান ভূমিকা পালনকারী শ্রদ্ধেয় করুণাবংশ ভান্তেকে বাদে সবার আগে কৃতজ্ঞতার অদৃষ্ট অথচ মূল্যবান উপহারটি তার জন্যই তুলে রাখলাম। মনে মনে আন্তরিক প্রার্থনা করি, “বিমল, সমস্যাসংকুল গৃহীজীবনে সুখ তোমার ছায়াসঙ্গী হোক!”
সত্যি বলতে কী, যাকে ছাড়া এ কোর্সটি ভাবাই যায় না, কমপ্লিট করার কল্পনাও করা যেতো না, পালি ভাষায় আসলেই অকর্মার ঢেঁকি রয়ে যেতাম, আর সেসবের পথে আলোর দিশারি হয়ে যিনি এগিয়ে এসেছেন তিনি হচ্ছেন পরম করুণার আধার ও আমার প্রিয় শিক্ষক শ্রদ্ধেয় করুণাবংশ ভন্তে। তিনি পরম মমতায় শিক্ষা দিয়েছেন, নির্দেশ দিয়েছেন ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন। তার গুণ কখনো পরিমাপ করা যাবে না। তার ঋণও কখনো পরিশোধযোগ্য নাম। একজন শিক্ষক হিসেবে ছাত্রকে যা যা শেখানো দরকার তিনি অকৃপণভাবে সেগুলো শিখিয়েছেন। কতোটা কৃতজ্ঞতা প্রকাশে একজন শিক্ষককে একটু হলেও যথার্থ কৃতজ্ঞতা জানানো হয়েছে বলা হয় অথবা কৃতজ্ঞ থাকা যায় সেটা আমার জানা নেই। তারপরও ভন্তের এ মহৎ মহৎ উপকারের জন্য অন্তরের অন্তস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা জানাই ও নতশিরে বন্দনা নিবেদন করি। ভবিষ্যতে এ অর্জিত শিক্ষায় কাজের সফলতা দিয়ে ভন্তের স্বপ্ন পূরণের অংশীদার হয়ে কিছুএকটা উপহার দিতে পারলেই কিছুটা হলেও যথার্থ কৃতজ্ঞতা জানাতে পেরেছি বলে মনে করবো।
এখন ফিরে তাকায় এ শিক্ষা কোর্সে নিরবে যারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিঃস্বার্থ সহযোগিতা করে মহান অবদান রেখেছেন। প্রথমে কৃতজ্ঞতা জানাই নালন্দা বন বিহারের সুযোগ্য অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় আনন্দ ভন্তেকে। যার অবদান এ শিক্ষা কোর্সে অপরাপর সহায্যকারী মহান ব্যক্তিদের চাইতে কোনো অংশে কম নয়, বরং বেশিই। আনন্দ ভন্তের সঙ্গে যখন পরিচয় ছিলো না তখন আমার একটা ভূল ধারণা কাজ করতো। মানে কোনো কোনো ভিক্ষুর কাছে শুনেছি যে তিনি নাকি তার বিহারে একা একা থাকেন। তখন মনে করতাম তাহলে তিনি নিশ্চয়ই ওলোঝোলো সাধক টাইপের হাড় ঝিরঝিরে মিনমিনে স্বভাব, রাগী ও মহাকৃপণ ব্যক্তি হবেন। অথচ বাস্তবে এখানে (নলবনিয়াতে) এসে দেখি একদম আমার ধারণার বিপরীত, বলা যায় আকাশ পাতাল ব্যবধান।
সেদিন এসে প্রথমে যখন তাকে বন্দনা করতে গেলাম তখন সত্যি সত্যি আমি বোকা বনে গেলাম। কোথায় ঝিরঝিরে হাড়, কোথায় মিনমিনে স্বভাব, কোথায় রাগ আর মহাকৃপণতা!! না জানি সত্যি সত্যি ধ্যানলাভী ভিক্ষু হলে আমার অবস্থা হাঁদারাম গঙ্গারামের মতো হতো কি না। পাঠক বুঝুন তাহলে অবস্থা। মানুষের মন কখন যে রাম-টাম যদু-মধু হতে শুরু করে, মনভাসির টানে কতো কিছুই না ভেবে যায়!
যাক, তিনি এমনটা হলে কি অত মহান অবদানের কাজ করতে পারতেন? এমনটি নন বলেই তো তিনি নিঃস্বার্থ সহযোগিতার উদার হাতটুকু বাড়িয়ে দিতে পেরেছেন। এতো উদার মনের মানুষ বলেই তো অভাজন আমাদের জন্য এত কিছু করতে পেরেছেন। আমি প্রায় অবাক না হয়ে পারতাম না, যখন তিনি আমাদের কোনোকিছুর প্রয়োজন পড়েছে বলে জানতেন তা যতো তাড়াতাড়ি পারা যায় ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। হ্যাঁ পাঠক, ভন্তে আসলে একজন শিক্ষানুরাগী ও খুবি পেল্লায় দিলদরিয়ার মানুষ। যারা তার কাছের মানুষ তারা সবাই ভালো করেই জানেন।
আমি যখন এ প্রবন্ধটা লিখছি তখন আমাদের পেছনে তার যা খরচ হয়েছে তা নিয়ে একটু জানতে চেষ্টা করলাম (যদিও ভন্তেকে খরচের কথা বলে অস্বস্তিতে ফেলতে চাইনা)। জানা অজানা খরচের হিসাব অনুমান করে দেখি আমাদের থাকার কুটির, শিক্ষার উপকরণ ও নানান সময়ে টুকিটাকি এই-সেই মিলে কমসেকম তিন থেকে চার লক্ষ টাকার খরচ হয়েছে। হিসাব মিলিয়ে আমি তো রীতিমতো থ হয়ে গেলাম! মাত্র এক বছরেরও কিছু কম সময়ে এত্ত বড়ো খরচ! শিক্ষার পেছনে এতো উদারতা! এতো নিঃস্বার্থ সহযোগিতা! ভাবাই যায় না! বর্তমানে যেরকম আউলা-ঝাউলা মনের যুগ চলছে। এ আউলা-ঝাউলা মনের যুগে কতোটা হৃদবান হলে এমন স্বার্থহীন কাজগুলো নিঃস্বার্থভাবে করা যায় তা আসলে বড়োই ভেবে দেখার বিষয়। আনন্দ ভন্তের এ মহান অবদানের কথা লিখে শেষ করা যাবে না, তাই ব্যর্থ চেষ্টা না করাই শ্রেয় জ্ঞান করছি। তারপরও যৎসামান্য কৃতজ্ঞতা জানানোর চেষ্টা করেছি আর কী।
আর এখানকার উপাসক-উপাসিকাদের অর্থাৎ নলবনিয়া এলাকাবাসীদের কথা আর কী বলব। পথ নির্দেশক যখন অতটা উদারচেতা হন তখন তার সহযাত্রীরা কি উদার না হয়ে পারেন? কেউ আলোর মশাল জ্বালিয়ে দিলে কি আশেপাশের মানুষ আলোর দীপ্তি থেকে বঞ্চিত হন? সুতরাং তাদের কথা বেশি লিখতে হবেনা আশাকরি। তারপরও দু’লাইন লিখি। এখানে ভিক্ষু-শ্রামণের থাকার অনুকূল পরিবেশের মধ্যে প্রথমত জায়গাটাকেই বলতে হবে। এরপর উদার মনের মানুষগুলো, অর্থাৎ শ্রদ্ধাবান উপাসক-উপাসিকারা। ধর্মীয় আচার-আচরণে কমবেশি তারতম্য থাকলেও বড়দের থেকে শুরু করে স্কুলে যাওয়া ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরাও পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোনো ভিক্ষু শ্রামণকে দেখতে পেলেই ঠায় দাঁড়িয়ে সম্মান জানায়।
রাঙামাটি রাজ বন বিহারে দেখেছি বিহার সীমার ভেতরেও কোনো কোনো জিন্স-টাই-চশমা পরা যুবক-যুবতী ও বাবুদেরকে পথ ছেড়ে দিতে হয় খোদ আমাদেরকেই, অর্থাৎ ভিক্ষু-শ্রামণদেরকে। তা না হলে যে গা ধাক্কায় ছিটকে পড়ে যেতে হতে পারে। অথচ বৌদ্ধ প্রতিরুপ দেশে আমরা দেখি ছোট্ট শ্রামণটিকেও বড়ো বড়ো মন্ত্রীরা পর্যন্ত তার প্রাপ্য সম্মানটুকু জানাতে ভোলেন না।
যাক, এবার মূল বিষয়ে ফিরে যাই। এখানে পিণ্ডচারণের বেলায়ও খুব কমই টান পড়তে দেখেছি, বরং প্রায়ই বেশি বেশি হয়েছে। আমার মতে একজন সংসার বিরাগী ভিক্ষুর জন্য সাদামাটা লাইফ স্টালের জন্য যতটুকু পাওয়ার প্রয়োজন তার চেয়ে ঢের বেশি পাওয়া হয়েছে। তাদের শ্রদ্ধার ঝুলি, স্নেহের ঝুলি ও ভালোবাসার ঝুলি আমাদের জন্য নিঃস্বার্থভাবে সবসময় উন্মুক্ত থাকত। আমার জানা ও দেখা অন্যসব জায়গা থেকে এ জায়গার ধর্মীয় পরিবেশ ও মানুষগুলোর ধর্মীয় আচার-ব্যবহার অনেকটা অনুকূল ও পরিপাটি বলা যায়। মোটকথায় ভিক্ষু-শ্রামণের জন্য সব মিলিয়ে এ জায়গাটি একদম নির্ভরযোগ্য ও অনুকূল বলা যায়। সুতরাং এতদিন যাবৎ তাদের এ অপরিমেয় সহযোগিতার জন্য এ সামান্য লেখায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করা যাবেনা। তারপরও এটুকুই শুধু বলি, সবার প্রতি অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা।
সেই জানুয়ারিতে কোর্সে চলে আসার সময় বান্দরবান করুণাপুর বনবিহারের অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় ধর্মদীপ্তি ভন্তে ও নানিয়ারচর হাতিমারার চিত্তারাম বনবিহারের অধ্যক্ষ শ্রদ্ধেয় মৈত্রীলংকার ভন্তে নানান প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে (বিশেষত আমাকে) সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন তাদের জন্যও অসংখ্য কৃতজ্ঞতা। এরপর নাম না জানা আরো অনেকে নিরব ভূমিকায় সহযোগিতার হাতটুকু বাড়িয়ে দিয়ে কোর্সটিকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে এগিয়ে এসেছেন বিভিন্ন সময় তাদের সবার জন্যও অশেষ অশেষ কৃতজ্ঞতা।
মোদ্দা কথায় বলবো, পালি শিক্ষা কোর্সে প্রাপ্ত বুদ্ধশিক্ষার আলোকে আমার চলমান ধর্মীয় জীবনাচার ও ভবিষ্যত জীবনাচার যেন কল্যাণের দিকেই এগিয়ে নিয়ে যায় সে-রকম একটা জীবনাদর্শ গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করবো, এ আশা ব্যক্ত করে আমার এই দু’পাতার উজ্জ্বল ও অমলিন স্মৃতির দীন পঙক্তিমালা এ পর্যন্ত লিখেই ইতি টানছি। সবার যার যার অভিষ্ট লক্ষ্য পূরণ হোক, অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে এই কামনাই করছি।






